মাহমুদের মহাফেজখানা (Mahmud Writes) · সকল লেখা · বই

মোগল কর্মচারীর বইয়ে ধর্মীয় সহাবস্থান, গুরু নানক ও হাস্‌সু তেলি

লেখক: · ২০ জুন, ২০২৬ · বিভাগ: ইতিহাস

akbar's mughal court

শাহ জাহানের সময়কার এক মোগল প্রশাসনিক কর্মচারী সুরত সিং। তিনি হাস্সু‌ তেলি নামের এক দরবেশকে নিয়ে একটি বই লিখেছেন। পাশাপাশি বইটি সুরতেরও আত্মজৈবনিক। তবে বইটি আরেকটি কারণে বিশেষভাবে লক্ষ্যনীয় ও স্মরণীয়। এতে মোগল আমলে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সহাবস্থানের প্রমাণ মেলে

ভারতীয় উপমহাদেশে আজও মোগল আমল নিয়ে আলোচনা হয়। হওয়ার নানা কারণও আছে। প্রায় ২৫০ বছর আগে শেষ হয়ে যাওয়া এই শাসনামলের নানা বিষয় আজও প্রাসঙ্গিক। তবে সম্প্রতি মোগল সাম্রাজ্যকে ঘিরে জনপরিসরের আলোচনাগুলো প্রায়ই ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে সংঘাতের দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু ১৭শ শতকের ভারতের টিকে থাকা নথিপত্রগুলো প্রায়ই আরও জটিল এক বাস্তবতার কথা বলে। সেখানে ধর্মীয় বিবাদ নয়, বরং সংমিশ্রণ দেখা যায়।

এমনই একটি দলিল বর্তমানে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত রয়েছে। দলিলটি এমন এক সামাজের আভাস দেয়, যেখানে ধর্মীয় পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ ছিল ঠিকই, কিন্তু তা সবসময় কঠোর বিভাজনরেখা হিসেবে কাজ করত না। দলিলটি মূলত একটি বই। নাম তাজকিরা-ই পীর হাস্সু তেলি। একটি নিবন্ধের মাধ্যমে বইটিকে আলোচনায় এনেছেন আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সৈয়দ আলী নাদিম রেজাভী।

১৬৪৪ থেকে ১৬৪৭ সালের মধ্যে (শাহজাহানের শাসনামলে রচিত) এই গ্রন্থে মুসলিম সাধক পীর হাস্সু তেলি ও তার উত্তরসূরিদের জীবন ও অলৌকিক ঘটনাবলি বর্ণনা করা হয়েছে। আগ্রহদ্দীপক বিষয় হলো, এই মুসলিম সাধকের জীবনী রচনা করেছিলেন সুরত সিং নামে এক হিন্দু মোগল কর্মকর্তা। তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যের অনুসারী হয়েও ওই সাধকের ভক্ত ছিলেন।

সুরত সিং ছিলেন পাঞ্জাবের এক কাম্বো পরিবারের সন্তান। তিনি পীর হাস্সু তেলি ও তার উত্তরসূরি শেখ কামালকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক আধ্যাত্মিক তরিকার শিষ্য হয়ে ওঠেন। ফলে, তাজকিরা মূলত একজন ‘বিশ্বাসী’র লেখা বলে বিবেচনা করতে হবে।

কে ছিল এই সুরত সিং? সুরত ছিলেন পাঞ্জাবের এক কাম্বো পরিবারের সন্তান। তার পূর্বপুরুষরা ছিলেন ব্যবসায়ী। তবে সপ্তদশ শতকের শুরুতে তার পরিবার মোগল প্রশাসনে যোগ দেয়। লাহোর, ভাটিন্ডা, কাবুল ও আগ্রার মধ্যে বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে কাজ করেছেন সুরত সিং।

এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি পীর হাস্সু তেলি ও তার উত্তরসূরি শেখ কামালকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক আধ্যাত্মিক তরিকার শিষ্য হয়ে ওঠেন। ফলে, তাজকিরা মূলত একজন ‘বিশ্বাসী’র লেখা বলে বিবেচনা করতে হবে।

সুরত সিংয়ের পরিচয় আসলে বহুমুখী। ধর্মের দিক থেকে তিনি ছিলেন হিন্দু। কাম্বো জাতির সদস্য। অন্যদিকে মোগল কর্মচারী ও ফারসি কবি। সর্বোপরি তিনি হয়ে ওঠেন এক মুসলিম সাধকের শিষ্য। এসব পরিচয় তার কাছে পরস্পরবিরোধী ছিল না; বরং ছিল একই জীবনের বিভিন্ন দিক। বস্তুত তার মধ্যে ছিল আধ্যাত্মিক উদারতা।

সুরত সিংয়ের আধ্যাত্মিক উদারতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় তার স্বপ্নবিষয়ক বর্ণনায়। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ না করেও তিনি লিখেছেন যে, স্বপ্নে তিনি মক্কায় হজ পালন করেছেন এবং নবী মুহাম্মদের (স.) সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। কীভাবে তিনি নবীর কাছে গিয়েছিলেন বইয়ে সে কথা বর্ণনা করেছেন। লিখেছেন তিনি স্বপ্নে নবীর সাক্ষাৎ পেয়েছেন এবং তাঁর পাশে ইমাম আলীকে (রা.) দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলেন। অন্য কিছু দর্শনে তিনি খাজা মইনুদ্দিন চিশতি এবং বাবা ফরিদ গঞ্জে শকরের মতো বহু সাধকের সঙ্গেও সাক্ষাতের দাবি করেন।

নিজের লেখাতাজকিরায় বহুবার বাবা নানক-এর উল্লেখ রয়েছে।  প্রতিবারই তাকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়েছে। এক পর্যায়ে সুরত সিং এমন এক দর্শনের (দেখা হওয়া) কথা বর্ণনা করেন, যেখানে গুরু নানক ও সুরতের আধ্যাত্মিক গুরু পীর হাস্সু তেলিকে একই রূপে দেখা যায়।

এই বিবরণগুলোকে আরও একটি কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। সুরত সিং নিজেকে একজন গর্বিত হিন্দু হিসেবেই দেখেছেন এবং নিজের ধর্মীয় পরিচয় ও এসব গভীর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার মধ্যে কোনো বিরোধ অনুভব করেননি। তিনি এসব অভিজ্ঞতাকে এমনভাবেই উপস্থাপন করেছেন, যেন এগুলোর কোনো ব্যাখ্যা বা আত্মপক্ষসমর্থনের প্রয়োজন নেই। এদিকে গুরু নানকের প্রতিও সুরত সিংয়ের ছিল ভক্তি।

নিজের লেখাতাজকিরায় বহুবার বাবা নানক-এর উল্লেখ রয়েছে।  প্রতিবারই তাকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়েছে। এক পর্যায়ে সুরত সিং এমন এক দর্শনের (দেখা হওয়া) কথা বর্ণনা করেন, যেখানে গুরু নানক ও সুরতের আধ্যাত্মিক গুরু পীর হাস্সু তেলিকে একই রূপে দেখা যায়।

বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। পীর বা গুরুকে যারা ভক্তি করে তারা অনেক সময় একাদিক পীরকে একই সত্ত্বা বলে বিশ্বাস করে। স্বপ্নে কিংবা ভাবের ঘোরে তারা নিজের ভিন্ন ভিন্ন পীরকে একই সত্ত্বায় দেখতেই পারেন। এক্ষেত্রে পীর বলতে ঐ নির্দিষ্ট ব্যক্তির গুরু বা তিনি যাকে/যাদেরকে গুরু মনে করেন তাদের কথা বলা হচ্ছে। সুরতের ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতার শিক্ষা হলো—আধ্যাত্মিক সত্য বাহ্যিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে।

সুরত করতারপুরে গুরু নানকের সমাধিস্থল পরিদর্শন করেছেন। সে কথাও বইটিতে রয়েছে। সুরত কীভাবে তার মাকে নিয়ে সেখানে গিয়েছিলেন এবং একটি শ্মশানস্মারক ও একটি সমাধি পাশাপাশি দেখেছিলেন সে কথা লিপিবদ্ধ করেছেন। তাকে গুরু নানকের মৃত্যুর ঘটনা শোনানো হয়েছিল। ঘটনাটি সুপরিচিত। হিন্দুরা চেয়েছিল গুরু নাককের দেহ দাহ করা হোক, মুসলমানরা চেয়েছিল তাকে দাফন করতে। কাহিনি অনুযায়ী, সেখানে দুটি দেহ দেখা যায় একটি দাহ করা হয়, অন্যটি দাফন করা হয়। সুরত সিং এই লোককথাকে (ওরাল ট্রেডিশন) গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে লিপিবদ্ধ করেছেন।

এই বিষয় বা ঘটনাগুলোকে বিজ্ঞান ও যুক্তি দিয়ে বিচার করতে গেলে ভুল হবে। ঘটনাগুলো একেবাবেই আধ্যাত্মিক। অধ্যাত্মে বিশ্বাস না থাকলে বিষয়গুলোকে ব্যক্তির ভাবপ্রবণতা বলে ধরে নেয়া যায়। তবে একথা মানতে হবে, এর মধ্যে ধর্মীয় সহাবস্থানের বার্তা আছে। এই বর্ণনা, দর্শন (ফিলোসফি) ও সুরতের অভিজ্ঞতাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না। সুরত সিং শাহজাহানের আমলে লাহোরে বসবাস করতেন। তার মহল্লায় হিন্দু ও মুসলমানরা পাশাপাশি বসবাস করতেন। তাদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ হলেও দাঙ্গা-হাঙ্গামা হতো না। এছাড়া ধর্মীয় বিষয়েও কোন্দলের পরিমাণ ছিল কম। অন্তত বর্তমানের তুলনায় রাজনৈতিক ন্যারেটিভ তৈরি হতো না।

সুরত সিংয়ের আজীবনের প্রতিবেশী ছিলেন আবদুল করিম। এই মুসলিম পণ্ডিতের কাছেই সুরত ফারসি শিখেছিলেন। দুই পরিবার পাশাপাশি বসবাস করত। যা আগ্রা, লাহোর ও বারাণসীর মতো মোগল নগরীগুলোতে এই রকম সহাবস্থান খুবই সাধারণ দৃশ্য ছিল। ধর্মীয় বাহাস হতো, আবার এক ধর্মের অনুসারিরা অন্য ধর্মের উৎসবেও অংশ নিতেন।

শাহ জাহানকে সাধারণত তার স্থাপত্যকীর্তির জন্য স্মরণ করা হয়, পাশাপাশি তার শাসনামলে তুলনামূলকভাবে আরও রক্ষণশীল ইসলামী নীতির দিকে ঝোঁকার কথাও বলা হয়। কিন্তু তাজকিরা সেই ধারণাকে আরও জটিল করে তোলে।

আরো ছিল সাহিত্য, কবিতা পাঠ ইত্যদির আয়োজন। সুরত সিং সেই সাহিত্য-সংস্কৃতিরও সক্রিয় অংশ ছিলেন। আয়োজনগুলো হিন্দু ও মুসলমানদের একত্রিত করত। আগ্রায় অনুষ্ঠিত এক মুশায়রা বা কবিতা আসরের কথা উল্লেখ করেছেন সুরত সিং। সেখানে তিনি উপস্থিত ছিলেন অন্যান্য কবিদের সঙ্গে, যাদের মধ্যে ছিলেন বিখ্যাত হিন্দু ফারসি কবি মুন্সি চন্দ্র ভান। তিনি চন্দ্রভান ব্রাহ্মণ ও বা চন্দর ভান ব্রাহ্মন নামেও পরিচিত।

এই মুশায়রায় সমসংখ্যক হিন্দু ও মুসলিম কবি অংশগ্রহণ করেছিলেন। একজন হিন্দু কর্মকর্তা মুসলিম কবিদের পাশে বসে নিজের কবিতা আবৃত্তি করতে পারতেন এবং কেবল সাহিত্যিক গুণের ভিত্তিতেই মূল্যায়িত হতেন। তাদের মধ্যে ছুৎমার্গ ছিল না।

শাহ জাহানকে সাধারণত তার স্থাপত্যকীর্তির জন্য স্মরণ করা হয়, পাশাপাশি তার শাসনামলে তুলনামূলকভাবে আরও রক্ষণশীল ইসলামী নীতির দিকে ঝোঁকার কথাও বলা হয়। কিন্তু তাজকিরা সেই ধারণাকে আরও জটিল করে তোলে। অবশ্য মোগল ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় আকবর ও জাহাঙ্গীরের—বিশেষত আকবরের—শাসনামলের মতো উদার দর্শন কখনোই দেখা যায়নি। সেই তুলনায় শাহ জাহান নিজে ও তার শাসন আমল সুন্নি ধারা বেশি পালন করত। কিন্তু সেখানে কঠোরতা ছিল না। হিন্দুত্ববাদও তখন অবধি মাথাচাড়া দেয়নি। শিখদের মধ্যেও জঙ্গি মনোভাব দেখা দিতে তখনো কিছু দেরী।

সুরত সিং শাহজাহানের শাসনের মধ্যবর্তী সময়ে এই গ্রন্থ লিখেছিলেন। তিনি বাদশাহর প্রশাসনে দায়িত্ব পালন করতেন। তবুও তিনি একজন হিন্দু ভক্ত হিসেবে একজন মুসলিম সাধকের ফারসি জীবনী লিখতে, নবী মুহাম্মদকে স্বপ্নে দেখার অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করতে, গুরু নানকের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবং মুসলমানদের সঙ্গে পাশাপাশি বসবাস করতে সম্পূর্ণ স্বাধীন বোধ করেছিলেন। এই সময়ে ভারতের কোনো সরকারী কর্মচারী ভিন ধর্মের কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে লেখার ক্ষেত্রে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন না।

মোগল বাদশাহ বাবুর গুরু নানকের সঙ্গে কথা বলছেন

এটি ইঙ্গিত করে যে, মোগল সাম্রাজ্যের চরিত্রকে কেবল তার শাসকের ব্যক্তিগত নীতির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায় না। শাহ জাহানের ব্যক্তিগত ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি যাই হোক না কেন, তার শাসিত সমাজের দৈনন্দিন জীবন ছিল গভীরভাবে বহুত্ববাদী।

সৈয়দ আলী নাদিম রেজাভী তাজকিরা-ই পীর হাসসু তেলিকে ‘এক বিস্মৃত কণ্ঠস্বর’ বলে উল্লেখ করেছেন। কেননা এটি প্রায় হারিয়েই গেছে কালের গহ্বরে। কিন্তু সুরত সিংয়ের পাণ্ডুলিপির গুরুত্ব নিহিত রয়েছে তার সাধারণত্বের মধ্যেই। সম্রাট বা যুদ্ধের গল্পের পরিবর্তে তার তুলে ধরে একজন মধ্যম স্তরের কর্মকর্তার জীবন। তিনি শহর থেকে শহরে ঘুরেছেন, সাহিত্যসভায় অংশ নিয়েছেন, আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শকের অনুসরণ করেছেন এবং দৈনন্দিন জীবনযাপন করেছেন।

আজ সারা পৃথিবীতেই ইতিহাসের বয়ানগুলো ক্রমশ কঠোর সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ভিত্তিতে নির্মিত হচ্ছে। এমন সময় সপ্তদশ শতকের সুরত সিংয়ের কণ্ঠস্বর আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে অতীত ছিল অনেক বেশি আন্তঃসম্পর্কযুক্ত, জটিল এবং সম্ভবত আমাদের বর্তমানের সরলীকৃত ইতিহাসচর্চার তুলনায় অনেক বেশি মানবিক।

তাজকিরা-ই পীর হাস্সু তেলি তাই এমন এক দলিল হিসেবে স্মরণীয় হওয়া উচিত। কেননা এটি দেখায়, উপমহাদেশে মানুষ আসলে কীভাবে জীবনযাপন করত।

 

সম্পর্কিত লেখা