আকবর: জ্ঞান চর্চায় ‘অশিক্ষিত’ বাদশাহর অবদান
লেখক: মাহমুদ (Mahmud) · ২ এপ্রিল, ২০২৬ · বিভাগ: ইতিহাস
ইদানিং মোগল বাদশাহ আকবরকে ‘অশিক্ষিত’ বলার ধুম পড়েছে। ভারতের জনপ্রিয় টেলিভিশন ধারাবাহিকগুলোয় বিষয়টিকে অতিরিক্ত ফোকাস করা হয়। তবে এই চল পুরাতন। টেলিভিশন সিরিজের পাশাপাশি ইসলামি জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তিরাও (নিজেদের যারা আলেম বলে পরিচয় দেন) আকবরকে নিরক্ষর বলতে পছন্দ করেন। এর অন্যতম কারণ, আকরব একটি নতুন ‘ধর্মমত’ প্রচার করেছিলেন। এখন, আক্ষরিক অর্থে বলতে গেলে আকবরকে অক্ষরজ্ঞানহীন…
ইদানিং মোগল বাদশাহ আকবরকে ‘অশিক্ষিত’ বলার ধুম পড়েছে। ভারতের জনপ্রিয় টেলিভিশন ধারাবাহিকগুলোয় বিষয়টিকে অতিরিক্ত ফোকাস করা হয়। তবে এই চল পুরাতন। টেলিভিশন সিরিজের পাশাপাশি ইসলামি জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তিরাও (নিজেদের যারা আলেম বলে পরিচয় দেন) আকবরকে নিরক্ষর বলতে পছন্দ করেন। এর অন্যতম কারণ, আকরব একটি নতুন ‘ধর্মমত’ প্রচার করেছিলেন। এখন, আক্ষরিক অর্থে বলতে গেলে আকবরকে অক্ষরজ্ঞানহীন বলা যায় কেননা তিনি অক্ষয় চিনতেন না। কিন্তু আকবর তার সময়ের অনেক ব্যক্তির তুলনায় বেশি ‘শিক্ষিত’ ছিলেন। তার শিক্ষার মাধ্যম হয়েছিল শুনে ও দেখে শেখা।
ছোটবেলায় তাকে পড়তে–লিখতে শেখানোর সব প্রাথমিক প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছিল। ইতিহাসবিদ আঁদ্রে উইঙ্ক জানান আকবরকে শিক্ষাদানের বহু চেষ্টা হয়েছিল। তিনি কিছু কিছুর বর্ণনাও দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, শাহজাদার চার বছর চার মাস চার দিন পূর্ণ হওয়ার মুহূর্তেই শিক্ষার সূচনার জন্য জ্যোতিষশাস্ত্রসম্মত শুভ সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু আকবর সেই দিন উপস্থিতই হননি। তার শিক্ষকরা হয় ভীষণভাবে ব্যর্থ হন, নয়তো তাকে অন্য বিষয়ে দক্ষ করে তোলেন। একজন তাকে কবুতর ওড়ানোর শখে উৎসাহিত করেছিলেন (যদিও কেউ কেউ বলেন উল্টোটা হয়েছিল)। আরেকজন যথাসাধ্য চেষ্টা করে শেষে মক্কায় চলে যান। আকবরকে আগ্রহী করতে হুমায়ূন তাকে ফারসি কবিতা পাঠিয়েছিলেন কিন্তু আকবর তা ভদ্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেন।
তবে পড়া–লেখা শিখতে ব্যর্থ হলেও, আকবর অন্যান্য মোগল রাজপুত্রদের মতোই তুর্কি (তাদের মাতৃভাষা), ফারসি ভাষা জানতেন এবং হিন্দুস্তানের আচার–ব্যবহারে শিক্ষিত হয়েছিলেন। অক্ষরজ্ঞান না থাকলেও চিত্রকলায় তিনি পারস্যের ওস্তাদদের কাছে পাঠ নেন। কাঠের কাজের মতো কারুশিল্পেও পারদর্শী ছিলেন। অল্প বয়স থেকেই তিনি সামরিক প্রশিক্ষণ পান এবং দ্রুত সামরিক নেতৃত্বও গ্রহণ করেন।
ভবিষ্যৎ শাসক হিসেবে তিনি সতর্কতা ও সব পরিস্থিতিতে সমভাব বজায় রাখার গুণ অর্জন করেছিলেন। আকবরনামায় আবুল ফজল উল্লেখ করেন, বিচারকার্যে আকবর কেবল আইনের বিধানই নয়, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, নিজস্ব মূল্যায়ন এবং পরিস্থিতি ও ব্যক্তির চেহারার বৈশিষ্ট্যও বিবেচনা করতেন।
হুমায়ূন তার পুত্রদের কঠোর শিক্ষাব্যবস্থা ভ্রমণ বা দীর্ঘ সামরিক অভিযানের সময়ও বন্ধ রাখেননি। মোগল রাজকন্যারাও দরবার-নিযুক্ত শিক্ষিকার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্যশিক্ষা পেতেন। আর ডিজলেক্সিয়ায় আক্রান্ত আকবর ছোটবেলায় পড়াশোনায় আগ্রহ না দেখালেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞানার্জনে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এজন্য তিনি গুরুত্ব দেন নিজের স্মৃতির ওপর।

আকবরের ‘নিরক্ষরতা’ তার সময়ের তুলনায় অস্বাভাবিক ছিল না। উইঙ্ক বলেছেন, মধ্যযুগীয় ইউরোপের রাজাদেরও সব ক্ষেত্রে অক্ষরজ্ঞান ছিল না। লিপিকর ও কর্মকর্তারা সাহায্য করতেন। তবে আকবরের অসুখ ছিল। ১৯৮১ সালের প্রবন্ধ Akbar: Illiterate Genius-এ এলেন স্মার্ট ধারণা দেন যে আকবর হয়তো ডিসলেক্সিয়ায় ভুগতেন। অবশ্য সেকালে রোগটি চিহ্নিত করার তেমন সুযোগ ছিল না। তাই এর পক্ষে নিশ্চিত প্রমাণ নেই। অন্যদিকে অ্যানম্যারি শিমেল বলেন, ‘উম্মি শব্দটি কখনো কখনো আকবরের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে তবে কোরানে এর অর্থ ভিন্ন—দৈবপ্রেরণাপ্রাপ্ত জ্ঞানী। আবু আল-ফজল অতিরঞ্জিত ভাষায় তাকে ইলম-এ-লাদুনি (ঈশ্বরপ্রদত্ত জ্ঞান)-এর অধিকারী বলে বর্ণনা করেন।’
বাস্তবতা হলো, আকবর জানতেন তাকে অনেক কিছু শিখতে হবে। তিনি নিজেকে সেভাবেই প্রস্তুত করেছিলেন। সাহিত্য, গণিত, দর্শনসহ বহু বই তিনি ফারসিতে অনুবাদ করান। সেসব পড়ে শোনানো হতো তাকে। ইলম-এ-লাদুনি না থাকলেও তার ছিল সহজাত প্রতিভা। তার সময়কার ভ্রমণকারী, তার সমালোচনাকারীরাও একথা স্বীকার করেছেন। জেসুইট পুরোহিত ও ভ্রমণকারী অ্যান্টোনিও মনসারেত আকবরকে ‘অসাধারণ বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন’ ও ‘দারুণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী’ বলে উল্লেখ করেন। তার পুত্র জাহাঙ্গীর তার আত্মজীবনী তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরীতে লিখেছেন, তার পিতা নানা ধর্মের জ্ঞানীদের সঙ্গে আলোচনা করতেন এবং সেই আলোচনার মাধ্যমে বহু বিষয় তার কাছে স্পষ্ট হতো। ফতেহপুর সিক্রির ইবাদতখানায় প্রতি বৃহস্পতিবার ধর্মীয় বিতর্ক অনুষ্ঠিত হতো সেকথা ইতিহাসে সুবিদিত।
আকবরের স্মৃতিশক্তি, বিশেষত শ্রুতিধারণ ক্ষমতা, ছিল অসাধারণ। তিনি যা শুনতেন তা মনে রাখতেন এবং নিজেই ঠিক করতেন কোন বই পড়ে শোনানো হবে। তার স্মৃতিশক্তি অনুবাদের জন্য বই নির্বাচন ও চিত্রসংযোজন নির্ধারণেও সাহায্য করত। মোগল মিনিয়েচারও এগিয়ে যায় এভাবেই।
আইন-ই-আকবরীতে উল্লেখ আছে, আকবরকে প্রতি সন্ধ্যায় বই পড়ে শোনানো হতো। মনোরম কণ্ঠের পাঠক তিনি বাছাই করতেন। বাদায়ূনী মাঝে মাঝে পাঠ করতেন। তিনি নিজেই লিখেছেন, তার সুমধুর কণ্ঠের জন্যই তিনি বাদশাহর নির্বাচিত পাঠক হন। কত পৃষ্ঠা পড়া হয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে তাদের পারিশ্রমিক নির্ধারিত হতো।

হুমায়ূনের একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার ছিল। আকবর তার পিতার থেকে প্রাপ্ত গ্রন্থাগারকে সম্প্রসারিত করেন। বিশেষত ফতেহপুর সিক্রিতে পাঠাগার বৃদ্ধি পায়। আকবরের গ্রন্থাগার বেশ বড় ছিল। চীনা পরিব্রাজক সুয়ানচাঙ সম্রাট হর্ষবর্ধনের গ্রন্থাগারের উল্লেখ করেছেন। নালন্দার বিখ্যাত গ্রন্থাগার ধর্মগঞ্জে তিনটি ভবন ছিল বলে জানা যায়। আকবরের গ্রন্থাগারে প্রায় ২৪,০০০ বই ছিল বলে ধারণা করা হয়। ভিনসেন্ট স্মিথ লিখেছেন, সে সময়ে এর তুলনা ছিল বিরল। এখানে জ্যোতির্বিজ্ঞান, সঙ্গীত, ধর্মতত্ত্ব, আইন ইত্যাদি নানা বিষয়ে বই ছিল। গ্রন্থাগারে লিপিকর, ক্যালিগ্রাফার, বাঁধাইকারকসহ নানা কর্মী ছিলেন।
শুরুতেই বলা হয়েছে আকবর অনুবাদে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। মক্তবখানা বা অনুবাদ দপ্তর গ্রন্থাগারের সঙ্গেই যুক্ত ছিল। আকবর সংস্কৃত, আরবি ও তুর্কি গ্রন্থ ফারসিতে অনুবাদ করান। ১৫৮২ সালে মহাভারতের ফারসি অনুবাদ রজমনামা নামে শুরু হয়। ইতিহাসবিদ অড্রে ট্রুশকে এই অনুবাদপদ্ধতির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন প্রথমে সংস্কৃত থেকে হিন্দিতে, তারপর ফারসিতে অনুবাদ করা হতো।
আকবর অনুবাদে মূল ভাব অক্ষুণ্ণ রাখা ও সহজবোধ্য করার ওপর জোর দিতেন। কখনও ভুল বা পক্ষপাতদুষ্ট ব্যাখ্যার জন্য তিনি ভর্ৎসনাও করতেন।
আকবরের পৃষ্ঠপোষকতায় চিত্রশালা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়। হামজনামা ছিল তার প্রথম বৃহৎ চিত্রায়িত প্রকল্প। এটি ১৫৫৮ সালে শুরু হয়ে ১৫ বছর ধরে চলে। শতাধিক শিল্পী এতে কাজ করেন। মোগল যুগে প্রতিকৃতি অঙ্কন ছিল এক অভিনব সংযোজন এবং শিল্পীরা প্রায়ই বাদশাহকে সঙ্গে দিয়ে অভিযানে যেতেন। সেখানে তারা শিকার, ভ্রমণে যা দেখতেন ছবিতেও তা আঁকতেন।
আকবরের যুদ্ধ, সাম্রাজ্য বিস্তার, হারেম নিয়ে বহু আলাপই হয়। কিন্তু তার পেছনে পড়ে থাকে জ্ঞান প্রসারের এই প্রয়াসগুলো। বাবুর নিজে রোজনামচা লিখেছিলেন, হুমায়ূন পড়তে ভালোবাসতেন। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য বাদশাহরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন। তবে আকবারই তার দরবারের কার্যবিবরনী লিখিয়ে রেখেছেন। লিখিত দলিল রাখায় জোর দিয়েছিলেন তিনি। লেখার পাশাপাশি চিত্রও রাখতেন যেন সবকিছুর স্পষ্ট একটি উপস্থাপন থাকে। পরবর্তী মোগলদের জন্য তার এই কর্মযজ্ঞ ছিল পাথেয়। আর এভাবেই কথিত অশিক্ষিত বাদশাহটি উদাহরণ রেখে যান।