মাহমুদের মহাফেজখানা (Mahmud Writes) · সকল লেখা · বই

হেলেন ক্যামকের ভিডিও আর্ট ও ‘মন্বন্তরে চার্চিলের দায়’ বিতর্ক

লেখক: · ২২ জুন, ২০২৬ · বিভাগ: ইতিহাস

churchill and helen cammock

১৯৪৩ সালে ভারতের দুর্ভিক্ষের পেছনে মূল দায় ব্রিটিশ সরকারের। একথা বহু আগে থেকেই বলা হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই সেই দায় যায় উইনস্টন চার্চিলের ওপর। কিন্তু তার ভক্ত ও ব্রিটিশদের একাংশ দাবি করে দুর্ভিক্ষে চার্চিল বা ব্রিটিশ সরকারের এতোটাও দায় নেই। সম্প্রতি হেলেন ক্যামক নামের এক শিল্পীর কাজের সূত্রে বিতর্কটি আবার সামনে এল।

লন্ডনের ন্যাশনাল পোর্ট্রেট গ্যালারিতে প্রদর্শিত হচ্ছে হেলেন ক্যামকের একটি ভিডিও আর্ট। অনেকগুলো স্থিরচিত্র জুড়ে তিনি এটি তৈরি করেছেন। গত নয় মাস ধরে প্রদর্শিত এই ভিডিওটি সম্প্রতি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কারণ, এই কাজটিতে ১৯৪৩ সালের মন্বন্তর নিয়ে একটি বক্তব্য আছে। ভিডিওতে ক্যামক বলছেন, চার্চিল বাংলার মানুষকে না খাইয়ে রেখেছিল। ৪০ মিনিটের ভিডিওকর্মটির নাম পার্সিস্টেন্স (২০২৫)।

২০১৯ সালে টার্নার প্রাইজ পেয়েছিলেন ক্যামক। বর্তমান কাজটিতে তিনি অলিভার ক্রোমওয়েলের আয়ারল্যান্ড বিজয়ের প্রসঙ্গ তুলেছেন। সেখানেও দুর্ভিক্ষ সংঘটিত হয়েছিল। দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্ণনায় ক্যামক বলেন, ক্রমওয়েল ‘গণহারে মানুষকে অনাহারে রেখেছিলেন, অনেকটা উইনস্টন চার্চিলের ভারতীয় জনগণকে ইচ্ছাকৃতভাবে অনাহারে রাখার মতো।’

বিতর্কটি প্রথম সামনে আনে ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য টেলিগ্রাফ। পত্রিকাটির শিল্পবিষয়ক সংবাদদাতা ক্রেইগ সিম্পসন লিখেছিলেন, ‘পার্সিস্টেন্স করদাতাদের অর্থায়নে পরিচালিত গ্যালারিতে প্রদর্শিত একাধিক জাতীয় ব্যক্তিত্বের সমালোচনা করেছে এবং ভুলভাবে দাবি করেছে যে চার্চিল ইচ্ছাকৃতভাবে ভারতীয়দের গণঅনাহারে ফেলেছিলেন।’

এ কথার সঙ্গে তিনি আরো যুক্ত করেন, শিল্পী আসলে এই বক্তব্যের মাধ্যমে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে চার্চিল যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে গণঅনাহার ব্যবহার করেছিলেন।

পরবর্তীতে এই প্রতিবেদনের ফলো-আপ করেছিলেন সিম্পসন। সেখানে তিনি চার্চিলের জীবনীগ্রন্থের (২০১৮) লেখক অ্যান্ড্রু রবার্টসের (ব্যারন রবার্টস অফ বেলগ্রাভিয়া নামেও পরিচিত) প্রসঙ্গ টানেন। তিনি তার বইয়ে দাবী করেছিলেন মন্বন্তরের দায় চার্চিলের নয়। বিষয়টিকে ‘নির্লজ্জ মিথ্যা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রবার্টস গ্যালারির পরিচালনা পর্ষদকে একটি চিঠিও পাঠিয়েছেন, যাতে চার্চিলের নাতিসহ ৫০ জন স্বাক্ষর করেছিলেন। দ্য টেলিগ্রাফ-এর ভাষ্য অনুযায়ী, চিঠিতে ভিডিওটিকে ‘আদর্শগত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভিডিওতে ব্যবহৃত একটি ছবি। সূত্র: ন্যাশনাল পোর্ট্রেট গ্যালারি

তবে বিতর্ক এখানেই থামছে না। চার্চিলের সমর্থকরা বহুদিন থেকেই দাবি করে আসছেন যে তার নীতির কারণে দুর্ভিক্ষ হয়নি। কিন্তু ২০১৯ সালের একটি গবেষণায় ওই সময়কার আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে ‘চার্চিল আমলের ব্রিটিশ নীতিগুলো বিপর্যয়টির নেপথ্যে কাজ করা গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল’। এই যুক্তির পক্ষে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে বলে দ্য গার্ডিয়ান সে সময় জানিয়েছিল।

আর্টনিউজ-কে একটি বিবৃতিতে পাঠিয়েছিলেন ক্যামক। তবে এতে তিনি বিতর্ক বা চার্চিল-সংক্রান্ত দাবির সরাসরি জবাব দেননি। তিনি বলেন, ‘এক বছর ধরে তৈরি করা আমার এই ৪০ মিনিটের চলমান চিত্রকর্মটি ঐতিহাসিকভাবে প্রতিকৃতির ভূমিকা এবং বর্তমান সময়ে তার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে ভাবনা প্রকাশ করে। এটি বিবেচনা করে কে সম্মানিত ও মহিমান্বিত হন, আর কে হন না; কার গল্প বলা হয়, আর কার গল্প বলা হয় না। কাজটি অনুসন্ধান করে ইতিহাস কীভাবে তৈরি হয়, কীভাবে তা টিকে থাকে এবং কীভাবে প্রতিকৃতি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার ব্যবস্থার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।’

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গ্যালারির আর্টিস্টস ফার্স্ট: কনটেম্পোরারি পার্সপেক্টিভস অন পোর্ট্রেচার প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে কমিশন করা হয়েছিল পার্সিস্টেন্স। জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারিতে ছড়িয়ে থাকা এই প্রদর্শনীতে ক্যামক ছাড়াও আরও আটজন শিল্পীর কাজ রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘এই কাজের জন্য গবেষণা প্রয়োজন ছিল—ন্যাশনাল পোর্ট্রেট গ্যালারির আর্কাইভ ও সংগ্রহের ভেতরে এবং বাইরে উভয় ক্ষেত্রেই। পুরো কাজজুড়ে আমি নানা ইতিহাস ও গল্প স্পর্শ করেছি—যার কিছু সরাসরি সংগ্রহশালায় উপস্থিত, আর কিছু বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে উঠে এসেছে। এক্ষেত্রে, যা সংগ্রহে আছে এবং যা অনুপস্থিত উভয় দিকের বিষয়গুলোই বিবেচিত হয়েছে।’

গ্যালারির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘ন্যাশনাল পোর্ট্রেট গ্যালারিতে আমাদের স্থায়ী সংগ্রহের পাশাপাশি শিল্পীদেরও সুযোগ দেওয়া হয় সংগ্রহকে কেন্দ্র করে নতুন শিল্পকর্ম তৈরি করার। হেলেন ক্যামকের এই কাজটি ২০২৩ সালে কমিশন করা হয়েছিল এবং ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে সাময়িকভাবে গ্যালারিতে প্রদর্শিত হচ্ছে। এটি শিল্পীর নিজস্ব নির্মাণ ও বর্ণনায় তৈরি এবং এতে ইতিহাস ও সমসাময়িক ঘটনাবলি নিয়ে তার ব্যক্তিগত প্রতিফলন রয়েছে। আমরা শিল্প-প্রকাশের স্বাধীনতাকে সমর্থন করি, যদিও গ্যালারিতে প্রদর্শিত শিল্পীদের সব মতামতের সঙ্গে আমরা একমত নাও হতে পারি।’

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গ্যালারির আর্টিস্টস ফার্স্ট: কনটেম্পোরারি পার্সপেক্টিভস অন পোর্ট্রেচার প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে কমিশন করা হয়েছিল পার্সিস্টেন্স। জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারিতে ছড়িয়ে থাকা এই প্রদর্শনীতে ক্যামক ছাড়াও আরও আটজন শিল্পীর কাজ রয়েছে।

প্রদর্শনীর লক্ষ্য হলো গ্যালারির প্রতিষ্ঠাকালীন নীতিকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করা, যেখানে ‘শিল্পীর কৃতিত্বের চেয়ে প্রতিকৃতিতে উপস্থাপিত ব্যক্তির খ্যাতিকে’ বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। প্রদর্শনীর বিবরণ অনুযায়ী, এটি ‘নয়জন সমসাময়িক শিল্পীর শিল্প-দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে নিয়ে আসে, যাদের গ্যালারির স্থায়ী সংগ্রহের সঙ্গে সংলাপ তৈরি করে নতুন কাজ সৃষ্টির জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।’ একই সঙ্গে এই কাজগুলো ‘প্রতিকৃতি শিল্পের শিকড়কে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য এর সম্ভাবনাকে নতুনভাবে কল্পনা করে।’

পার্সিস্টেন্স-এ ন্যাশনাল পোর্ট্রেট গ্যালারির ভবন, আর্কাইভ এবং প্রদর্শিত শিল্পকর্মের দৃশ্য রয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য স্থান ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আছেন ইথেল স্মিথ, আডা লাভলেস এবং শার্লট মিউ।

নিজের বিবৃতিতে ক্যামক আরও বলেন, ‘পার্সিস্টেন্স আমাদের বহুস্তরীয় ইতিহাসের উপস্থিতি বিবেচনা করতে আহ্বান জানায়। নিনা সিমোন একবার বলেছিলেন, ‘‘আমার মতে, একজন শিল্পীর দায়িত্ব হলো তার সময়কে প্রতিফলিত করা।’’ আর কখনো কখনো এর অর্থ হয় অতীতকে পুনর্বিবেচনা করা, অনুসন্ধান করা এবং প্রশ্ন তোলা। ন্যাশনাল পোর্ট্রেট গ্যালারি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জনসম্পদ। তাই এটি যে শিল্পকর্মগুলোর তত্ত্বাবধায়ক, সেগুলো নিয়ে এবং সেগুলোর ঐতিহাসিক ও সমসাময়িক প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে সংলাপ অব্যাহত রাখা অত্যন্ত জরুরি।’

 [আর্ট নিউজপেপার অবলম্বনে]

ট্যাগ: #ইতিহাস #চিত্রকলা

সম্পর্কিত লেখা