সিনেমায় বারবার ফিরে এসেছে ‘রামায়ণ’
লেখক: মাহমুদ (Mahmud) · ৪ নভেম্বর, ২০২৬ · বিভাগ: ইতিহাস
ভারতীয় চলচ্চিত্রের শুরুর দিকেই রামায়ণ নিয়ে নির্মিত হয়েছিল সিনেমা। ১৯১৭ সালে দাদাসাহেব ফালকে নির্মাণ করেন নির্বাক চলচ্চিত্র ‘লঙ্কা দহন’। রামায়ণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত সিনেমাটি ভারতীয় পৌরাণিক চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য সংযোজন। দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রেও রামায়ণের জনপ্রিয়তা ছিল ব্যাপক। বিশেষ করে তেলেগু সিনেমায়। তামিল, মালয়ালম ও বাংলা সিনেমাও নির্মিত হয়েছে রামায়ণ নিয়ে। অন্য সিনেমাতেও আছে রামায়ণ প্রসঙ্গ।
পৃথিবীর চারটি জনপ্রিয় ও কালোত্তীর্ণ মহাকাব্যের একটি রামায়ণ। বাল্মিকী রচিত এ মহাকাব্য কয়েক শতাব্দী মানুষকে প্রভাবিত করেছে। রামায়ণ থেকে গল্প, চরিত্র ও ঘটনা নিয়ে রচিত হয়েছে কাব্য। পববর্তী সময়ে গদ্যকাররা লিখেছেন গল্প, উপন্যাস। সাহিত্য সমালোচনায়ও বারবার এসেছে রামায়ণ। আধুনিক সময়ে সাহিত্যের গণ্ডি পেরিয়ে এ মহাকাব্য জায়গা করে নিয়েছে মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে। বিশেষ করে ভারতীয় সিনেমায় রামায়ণের উপস্থিতি বেশ পুরনো। কখনো সরাসরি মহাকাব্যের গল্প, কখনো নির্দিষ্ট কোনো চরিত্রের জীবন, আবার কখনো সমকালীন প্রেক্ষাপটে রামায়ণের পুনর্বয়ান বিভিন্নভাবে বড় পর্দায় ফিরে এসেছে এ আখ্যান।
ভারতীয় চলচ্চিত্রের শুরুর দিকেই রামায়ণ নিয়ে নির্মিত হয়েছিল সিনেমা। ১৯১৭ সালে দাদাসাহেব ফালকে নির্মাণ করেন নির্বাক চলচ্চিত্র ‘লঙ্কা দহন’। রামায়ণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত সিনেমাটি ভারতীয় পৌরাণিক চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য সংযোজন। পরবর্তী সময়ে ১৯৪৩ সালে বিজয় ভাট পরিচালিত ‘রাম রাজ্য’ মুক্তি পায়। প্রেম আদিব ও শোভনা সমর্থ অভিনীত সিনেমাটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে রাম-সীতা হিসেবে তাদের পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৪৩ সালের এ সিনেমাটি যুক্তরাষ্ট্রে প্রদর্শিত প্রথম ভারতীয় চলচ্চিত্র হিসেবেও পরিচিত। এরপর ১৯৬১ সালে বাবুভাই মিস্ত্রির ‘সম্পূর্ণ রামায়ণ’ মুক্তি পায়। হিন্দি চলচ্চিত্রে রামায়ণের পূর্ণ উপস্থাপনা এটি।

দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রেও রামায়ণের জনপ্রিয়তা ছিল ব্যাপক। বিশেষ করে তেলেগু সিনেমায়। ১৯৬৩ সালে সি পুল্লাইয়া ও সিএস রাও পরিচালিত ‘লবকুশ’ মুক্তি পায়। এনটি রামা রাও ও অঞ্জলি দেবী অভিনীত সিনেমাটি রামায়ণের উত্তরকাণ্ড অবলম্বনে নির্মিত। রামের দুই যমজ সন্তান লব ও কুশের বেড়ে ওঠা, তাদের সঙ্গে পিতার পরিচয় এবং পারিবারিক পুনর্মিলনের গল্প উঠে আসে এতে। বাপু পরিচালিত ‘শ্রী রাম রাজ্যম’ (২০১১) একই আখ্যানকে নতুন করে পর্দায় নিয়ে আসে। এতে রামের চরিত্রে ছিলেন নন্দমুরি বালকৃষ্ণ এবং সীতার ভূমিকায় নয়নতারা। ১৯৭১ সালে তিনিই নির্মাণ করেছিলেন ‘সম্পূর্ণ রামায়ণম’।
তামিল চলচ্চিত্রেও রামায়ণের উপস্থিতি কম নয়। কে সোমু পরিচালিত ‘সম্পূর্ণ রামায়ণম’ (১৯৫৮) এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। শিবাজী গণেশ, এনটি রামা রাও ও পদ্মিনী অভিনয় করেন সিনেমাটিতে। অন্যদিকে কন্নড় চলচ্চিত্রে ১৯৬৩ সালে ‘শ্রী রামাঞ্জনেয় যুদ্ধ’ মুক্তি পায়। রাম ও হনুমানের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে এটি নির্মিত। পরবর্তী সময়ে সিনেমাটির তেলেগু সংস্করণও নির্মিত হয়। এসব চলচ্চিত্রে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি ভক্তি, আনুগত্য ও নৈতিকতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।

মালয়ালম চলচ্চিত্রে রামায়ণের উপস্থাপনা কিছুটা ভিন্ন ধারার। জি অরবিন্দন পরিচালিত ‘কাঞ্চনা সীতা’ (১৯৭৭) ভারতীয় চলচ্চিত্রে মহাকাব্যটির অন্যতম ব্যতিক্রমী পুনর্বয়ান। সিএন শ্রীকান্তন নায়ারের নাটক অবলম্বনে নির্মিত সিনেমাটি মূলত উত্তরকাণ্ডের কাহিনী অনুসরণ করেছে। এখানে রামের দেবত্বের চেয়ে একজন রাজা হিসেবে তার সিদ্ধান্ত, দায়িত্ববোধ ও ব্যক্তিগত সংকটকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সবচেয়ে অভিনব বিষয় সিনেমাতে সীতাকে সরাসরি দেখানো হয়নি। প্রকৃতির সঙ্গে তার অস্তিত্বকে মিলিয়ে এক ভিন্ন চলচ্চিত্র ভাষা তৈরি করেছেন পরিচালক।
আধুনিক ভারতীয় চলচ্চিত্রে রামায়ণের গল্প বলার ধরনেও এসেছে পরিবর্তন। মণি রত্নম পরিচালিত ‘রাবণ’ (২০১০) এবং এর তামিল সংস্করণ ‘রাবণন’ মূল মহাকাব্যের পরিচিত চরিত্রগুলোকে সমকালীন প্রেক্ষাপটে হাজির করে। এখানে রাবণ চরিত্রের দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্ব পেয়েছে। একইভাবে রাজকুমার সন্তোষীর ‘লজ্জা’ (২০০১) সরাসরি রামায়ণের চলচ্চিত্রায়ণ না হলেও চার নারীর গল্পে সীতা চরিত্রের নানা প্রতিরূপ ব্যবহার করেছে।

অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রেও রামায়ণের বিস্তার ঘটেছে। ১৯৯৩ সালে মুক্তি পাওয়া ভারত-জাপান যৌথ প্রযোজনার ‘রামায়ণ: দ্য লেজেন্ড অব প্রিন্স রামা’ এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইউগো সাকো ও রামমোহন পরিচালিত সিনেমাটি অ্যানিমেশনের মাধ্যমে মহাকাব্যটিকে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়। এটি আজও সব শ্রেণীর দর্শকের কাছে জনপ্রিয়। ২০১০ সালে মুক্তি পায় ‘রামায়ণ: দ্য এপিক’ ও ‘লবকুশ: দ্য ওয়ারিয়র টুইনস’। এছাড়া ২০০৫ সালের অ্যানিমেশন সিনেমা ‘হনুমান’ এবং এর সিকুয়েল ‘রিটার্ন অব হনুমান’ শিশু-কিশোরের মধ্যে জনপ্রিয়তা পায়। এসব সিনেমায় পৌরাণিক চরিত্রগুলোকে আধুনিক অ্যানিমেশন প্রযুক্তির সাহায্যে নতুন প্রজন্মের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ওম রাউত পরিচালিত ‘আদি পুরুষ’ (২০২৩) রামায়ণনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণে প্রযুক্তির নতুন সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে। তবে সংলাপ, চরিত্রের চেহারা ও কাহিনীর উপস্থাপনা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখেও পড়েছে। অন্যদিকে এসএস রাজামৌলির আরআরআর (২০২২) সরাসরি রামায়ণের গল্প না বললেও রামায়ণের কিছু চরিত্র ও প্রতীকের অনুপ্রেরণা ব্যবহার করেছে।
বাংলা চলচ্চিত্রেও রামায়ণের উপস্থিতি রয়েছে। বিশেষ করে কলকাতার বাংলা সিনেমায় পৌরাণিক কাহিনির চলচ্চিত্রায়ণের আছে দীর্ঘ ইতিহাস। ১৯৩২ সালে নির্মিত প্রমথেশ বড়ুয়ার অপরাধী কিংবা ১৯৩০ ও ৪০-এর দশকের পৌরাণিক ধারার সিনেমাগুলোর পাশাপাশি রামায়ণ অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রও বাংলা সিনেমার ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে।

১৯৩৩ সালে মুক্তি পায় দেবকী বসু পরিচালিত ‘সীতা’। রণবীর কাপুরে প্রপিতামহ পৃথ্বীরাজ কাপুর এতে রামের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। সীতার চরিত্রে ছিলেন দুর্গা খোটে। ছবিটি শুধু বাংলা চলচ্চিত্রেই নয়, ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৩২ সালে জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচালনায় নির্বাক রামায়ণ নির্মিত হয়েছিল চারটি পর্বে। পরবর্তী সময়ে লবকুশ, সীতার পাতাল প্রবেশ ও বিশ্বামিত্রর মতো পৌরাণিক আখ্যানও বাংলা পর্দায় এসেছে। বাংলাদেশে এন রাশেদ চৌধুরী পরিচালিত চন্দ্রাবতী কথার কথাও বলা যায়। ষোড়শ শতকের কবি চন্দ্রাবতীর জীবন অবলম্বনে নির্মিত ছবিতে সীতার দৃষ্টিকোণ থেকে রামায়ণ পুনর্লিখনের বিষয়টি উঠে এসেছে।
সব মিলিয়ে ভারতীয় চলচ্চিত্রে রামায়ণ কেবল একটি পৌরাণিক কাহিনী নয়, বরং বারবার ফিরে আসা এক সৃজনশীল অনুপ্রেরণা। নীতেশ তিওয়ারি রামায়ণের পুরো গল্প দুই পর্বে নিয়ে আসছেন। প্রথম পর্বটি মুক্তি পাচ্ছে আজ। রণবীর কাপুর-সাই পল্লবী অভিনীত সিনেমাটি নিয়ে দর্শকের আগ্রহ তুঙ্গে। এখন দেখার বিষয় প্রযুক্তি ও তারকা কাস্ট নিয়ে নীতেশ রামায়ণকে কীভাবে তুলে ধরেন।