পুরাণ, লোককথা থেকে আধুনিক সাহিত্যে ভূমিকম্প
লেখক: মাহমুদ (Mahmud) · ২৫ অক্টোবর, ২০২৬ · বিভাগ: ইতিহাস
পুরাণে বারবারই এসেছে ভূমিকম্পের কথা। তবে তা যুক্ত করা হয়েছে কোনো শক্তিশালী দেবতা বা পশুর সঙ্গে। বিভিন্ন বিশ্বাস অনুসারে পৃথিবীকে বহন করে একটি প্রাণী। ভারতের পুরাণ অনুসারে প্রাণীটি হাতি, মঙ্গোলিয়ায় শুয়োর, জাপানে বিশালাকৃতির মাকড়সা এবং আনাতোলিয়ায় ষাঁড়। নানা অঞ্চলের পুরাণে প্রাণীটি ভিন্ন হলেও ভূমিকম্পের ধারণাটি একই রকম। প্রাণীটি যখন মাথা নাড়ে তখন ভূমিকম্প হয়।
৭৯ খ্রিস্টাব্দ। পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ নগর পম্পেই। তৎকালীন নাগরিক জীবনের সব ধরনের উপকরণই সেখানে ছিল। কিন্তু ভিসুভিয়াসের অগ্ন্যুৎপাতে ধ্বংস হয়ে গেল নগরটি। অগ্ন্যুৎপাত মানে কেবল আগ্নেয়গিরি থেকে লাভা বেরিয়ে নগরকে জ্বালিয়ে দেয়া না। অগ্ন্যুৎপাতের সময় ভূমিকম্প হয়। ভিসুভিয়াসের অগ্ন্যুৎপাতে কেঁপে উঠেছিল পম্পেই। কয়েক দিনের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যায় নগরটি। সে ধ্বংসের বর্ণনা দিয়েছেন লর্ড লিটন—তার ‘দ্য লাস্ট ডেজ অব পম্পেই’ উপন্যাসে। যদিও লিটনের এ বই কেবল ভূমিকম্প ও তার ধ্বংসাত্মক চেহারা নিয়ে লেখা না, তবে বিশ্বখ্যাত বইটিতে এর খণ্ডচিত্র মেলে। তবে ভূমিকম্পের চিত্র ও ভূমিকম্প সম্পর্কে লেখা হয়েছে আরো অনেক আগে থেকে।
পারস্যের সাহিত্য বহু প্রাচীন। ধারণা করা হয় এর বয়স সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি। সবকিছু লিখিত নেই। কিছু ঘুরেছে মানুষের মুখে। ফলে কিছু গল্পগাথাঁ পরিণত হয়েছে লোককথায়। এর মধ্যে আছে ভূমিকম্পের কথা। পরবর্তী সময়ে ফেরদৌসীর শাহনামা, আমির হামজার দাস্তানসহ পারস্যের নানা কাব্যে ভূমিকম্পের কথা এসেছে।
পারস্য থেকে সরে আসা যাক ভারতবর্ষে। ভারতের দুই প্রধান মহাকাব্য রামায়ণ ও মহাভারত। রামায়ণ রচিত হয়েছে মহাভারতের আগে। মহাভারতে সরাসরি ভূমিকম্পের কোনো ঘটনা পাওয়া যায় না। তবে একটি শ্লোকে দেখা যায় কৃষ্ণ বলেছেন—
অন্যায়াহ যদা পরম ভবতি,
তদা আপি পৃথিবী রোদতি, ভূমি বিপ্লবতি
এর অর্থ, ‘অন্যায় যখন চূড়ান্ত হয়, তখন পৃথিবীও কাঁদে, ভূমি কেঁপে ওঠে।’
এখানে ভূমিকম্পের কথা বলা হচ্ছে তা স্পষ্ট এবং বিষয়টিকে পাপের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। পাপের কারণে প্রাকৃতিক প্রতিশোধ হিসেবেই ভূমিকম্প আসে—এমন ধারণা বহু ধর্ম, বিশ্বাস ও লোককথায় রয়েছে।
মহাভারতে না থাকলেও রামায়ণের দুটি ঘটনাকে ভূমিকম্পের সঙ্গে তুলনা করা যায়। রামায়ণে আদিকবি লিখেছেন, লাঙলের আঘাতে ভূমি বিদীর্ণ করে সীতার জন্ম হয়। আমরা বর্তমানে জানি বড় ভূমিকম্পে মাটিতে ফাটল ধরে। সেখান থেকে কোনো শিশু বেরিয়ে আসা সম্ভব না। যজ্ঞাগ্নি থেকে দ্রৌপদীর উত্থানের মতো এটিও একটি কাব্যিক উপস্থাপন হওয়া সম্ভব। অন্যদিকে সীতা দ্বিতীয় অগ্নিপরীক্ষার কথা উঠলে মাতা ভূদেবীকে স্মরণ করেন। ভূদেবী উপস্থিত হন এবং সীতা পাতালে প্রবেশ করেন। রামায়ণের ঘটনাটি কম-বেশি সবারই জানা। পুরাণের এ ঘটনাকে ভূমিকম্পের সঙ্গে তুলনা করা যায়।

পুরাণে বারবারই এসেছে ভূমিকম্পের কথা। তবে তা যুক্ত করা হয়েছে কোনো শক্তিশালী দেবতা বা পশুর সঙ্গে। বিভিন্ন বিশ্বাস অনুসারে পৃথিবীকে বহন করে একটি প্রাণী। ভারতের পুরাণ অনুসারে প্রাণীটি হাতি, মঙ্গোলিয়ায় শুয়োর, জাপানে বিশালাকৃতির মাকড়সা এবং আনাতোলিয়ায় ষাঁড়। নানা অঞ্চলের পুরাণে প্রাণীটি ভিন্ন হলেও ভূমিকম্পের ধারণাটি একই রকম। প্রাণীটি যখন মাথা নাড়ে তখন ভূমিকম্প হয়।
গ্রিক পুরাণ অনুসারে ভূমিকম্পের কারণ সমুদ্রের দেবতা পোসাইডন। এ ধারণা অনুসারে পোসাইডন যখন দৈত্য পলিবটসকে কস দ্বীপে বন্দি করে তাকে আটকাতে পাথর ছুড়ে মারে, তখন ভূমি কেঁপে ওঠে। মজার ব্যাপার হলো কস একটি আগ্নেয় দ্বীপ। অগ্ন্যুৎপাতের কারণে সেখানে ভূমিকম্প হয়। তবে পোসাইডনই ভূমিকম্পের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যুক্ত ও পরিচিত পৌরাণিক চরিত্র। এমনও বর্ণনা আছে পোসাইডন রেগে গেলে তিনি সমুদ্র ও পৃথিবীকে ঝাঁকান। প্রাচীন চীনা সভ্যতা মনে করত ভূমিকম্প আসলে ক্ষমতাসীনকে পরিবর্তন করার ইঙ্গিত। অন্যদিকে মেসোপটেমিয়ার পুরাণে একে পাপের শাস্তি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে নর্স পুরাণে ভূমিকম্পের সঙ্গে যুক্ত লোকি। তিনি ওডিনের পুত্র। লোকি নিজের ইচ্ছা অনুসারে পৃথিবীতে ভূমিকম্প আনতে বা ঘটাতে পারে। তবে এর সঙ্গে আরো একটি ঘটনা আছে। লোকি তার দুষ্কর্মের কারণে বন্দি হয় একটি পাহাড়ের গুহায়। তাকে পাহারা দেয়ার জন্য একটি বিষধর সাপ রাখা হয়। এর বিষয় লোকির গায়ে পড়লে সে বেদনার তীব্রতায় পাহাড়টিতে কাঁপিয়ে ফেলে এবং তখনই ভূমিকম্প হয়।
পুরাণের সৃষ্টি বহু শতাব্দী আগে। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য সাহিত্যকর্মে সেসব প্রসঙ্গও এসেছে। পারস্যের সাহিত্যেও ভূমিকম্পের প্রসঙ্গ এসেছে পুরাণের হাত ধরে। কবি ফেরদৌসী তুসির শাহনামা কয়েকটি সম্ভাব্য ভূমিকম্পের কথা বলে। ১০১০ খ্রিস্টাব্দের এ মহাকাব্যে ভূমিকম্পের দেখা মেলে তবে ক্ষয়ক্ষতি বা মারাত্মক কোনো অবস্থা দেখা যায় না। তবে এ সময়য়ের পারস্যের পুরাণ-সাহিত্যে আজদাহার উল্লেখ পাওয়া যায়। আজদাহা এক ড্রাগনসদৃশ এক ধরনের পৌরাণিক প্রাণী। এটি নিজের শক্তি কখনো এমনভাবে প্রয়োগ করে যে ভূমিকম্প হয়। এছাড়া অপশক্তি নানা সময় মানুষের ক্ষতি করতে ভূমিকম্প তৈরি করে। আহিরমন এ ধরনের এক দানব। অন্যদিকে ঋগ্বেদে বরুণ, মারুৎ ও ইন্দ্রর অলৌকিক শক্তির দ্বারা ভূমিকম্প হওয়ার কথাও পাওয়া যায়।
বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় মাধ্যমে ভূমিকম্পের কারণ জানা গেছে। মাটির নিচে থাকা টেকটোনিক প্লেটের ঘর্ষণ, স্থান বদলের কারণে ভূমিকম্প হয়ে থাকে। ফলে পৌরাণিক বয়ান এখন আর প্রয়োজন নেই। তবে ভূমিকম্প হওয়ার কারণের চেয়েও জরুরি এর অভিঘাত। আধুনিক সাহিত্যে এ বিষয়গুলোই উঠে আসে। বহু লেখাতেই ভূমিকম্পের প্রসঙ্গ হয়তো এসেছে। তবে এর মধ্যে কয়েকটিই বিশেষ হয়ে উঠেছে।

১৮০৭ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশ হয় হাইনরিখ ভন ক্লাইস্টের ‘দ্য আর্থকোয়েক ইন চিলি’। উপন্যাসে ভূমিকম্পের পাশাপাশি এর প্রভাব ও সামাজিক অবস্থা এসেছে। নভেলাটি ১৬৪৭ খ্রিস্টাব্দে ঘটা সান্তিয়াগোর ভূমিকম্পের প্রেক্ষাপটে রচিত। উপন্যাসের শেষ হয় এক ট্র্যাজেডিতে। দেখা যায় তরুণ যুগলকে দুর্যোগের জন্য দোষারোপ করার পর, জনতার হাতে তুলে দিয়ে হত্যা করা হয়। কিন্তু ক্লাইস্টের উদ্দেশ্য আরো বড়। তিনি বলতে চান, আমি যা দেখি তা-ই বিশ্বাস করি। তবে দর্শনের বাইরে ভূমিকম্পের চিত্রও একটি গুরুত্ব বহন করে। তিনি লিখেছেন ‘কেবল তখনই, যখন সে ঘুরে দাঁড়িয়ে তার পেছনে শহরটিকে মাটির সঙ্গে মিশে যেতে দেখল, তখনই সে মনে করতে পারল সেই ভয়াবহ মুহূর্তগুলোর কথা, যার অভিজ্ঞতা তার আগে হয়েছিল। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়ে সে কপাল মাটিতে ঠেকালো, কেননা সে দৈববলে বেঁচে গেছে। আর যেন সেই একমাত্র ভয়ংকর স্মৃতিটি মনের ওপর ছাপ ফেলে অন্য সব স্মৃতি মুছে দিয়েছে। সে জীবনের আশীর্বাদ, তার সমস্ত সমৃদ্ধি ও বৈচিত্র্য এখনো ভোগ করতে পারছে—এ কথা ভেবে আনন্দে কেঁদে ফেলল।’
মাইরন ব্রিনিগের ‘দ্য ফ্লাটার অব অ্যান আইলিড’ প্রকাশ হয় ১৯৩৩ সালে। এ উপন্যাস লস অ্যাঞ্জেলেসকে কেন্দ্র করে রচিত আধুনিক ফ্যান্টাসি। তবে বইটির এখন প্রায় অপঠিত। উপন্যাসের শেষে এক মহাভূমিকম্পে পুরো ক্যালিফোর্নিয়া উত্তর আমেরিকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে ভেঙে পড়তে দেখা যায়। বইয়ের বর্ণনায়, ‘লস অ্যাঞ্জেলেস যেন একটানা এক জোর ধাক্কায় পানিতে নেমে যাচ্ছে, তীরবর্তী শহরগুলো প্রথমে, তারপর ভেতরের শহরগুলো; বাণিজ্যিক সড়ক, ভবন, হলিউডের চলচ্চিত্র স্টুডিও, যেখানে অভিনেতারা সরিষা-রঙা মেকআপে বিবর্ণ ও ফ্যাকাশে হয়ে পড়ছিল।’
ভূমিকম্পের চিত্র পাওয়া যায় ক্যারি ম্যাকউইলিয়ামসের ‘দ্য ফোকলোর অব আর্থকোয়েকস’-এ। ১৯৩৩ সালের লং বিচ ভূমিকম্পের প্রতিক্রিয়ায় লেখা হয় বইটি। এ প্রবন্ধে ভূমিকম্প-সংক্রান্ত মিথ ও কম্পনের উত্থাপিত আতঙ্ক—উভয়েরই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করেছেন লেখক। তিনি লিখেছেন, ‘ভূমিকম্প শব্দটির প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে, ক্যালিফোর্নিয়াবাসীকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়: প্রথমত, নিষ্পাপ নতুন আগতেরা, যারা কখনো ভূমিকম্প অনুভব করেনি, কিন্তু সবাইকে বলে বেড়ায় যে “মজারই তো মনে হয়”, দ্বিতীয়ত, যারা সামান্য ভূমিকম্প টের পেয়েছে এবং বিষয়টি ভালোই জানার কথা, কিন্তু তার পরও প্রচার করে যে ১৯০৬ সালের সান ফ্রান্সিসকো ভূমিকম্পই রাজ্যের একমাত্র বড় দুর্যোগ; আর সর্বশেষে, সত্যিকারের ভূমিকম্পের ভুক্তভোগীরা—যেমন সান ফ্রান্সিসকো, সান্তা বারবারা বা সাম্প্রতিক লং বিচের বাসিন্দারা। এদের কাছে শব্দটি ভয়ের পূর্ণ। তারা সামান্য কাঁপনাতেও সাড়া দেয়, আর কোনো ভারী ট্রাক রাস্তা দিয়ে গেলেই অস্থির হয়ে ওঠে।’

জন ফান্তের ‘আস্ক দ্য ডাস্ট’ও থাকবে তালিকায়। ১৯৩৯ সালের এ উপন্যাসকে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ। উপন্যাসটি তরুণ লেখক আর্তুরো বান্দিনির সংগ্রামের গল্প। বান্দিনি লং বিচ ভূমিকম্প থেকে বেঁচে যায়। সে মনে করে ঘটনাটি তার পাপের জন্য হয়েছিল। উপন্যাসের ভাষায়, ‘তুইই করেছিস, আর্তুরো। এ ঈশ্বরের ক্রোধ। তুইই করেছিস… অনুতাপ কর, দেরি হওয়ার আগে অনুতাপ কর। আমি প্রার্থনা করলাম, কিন্তু তখন মুখভর্তি ধুলায়। কোনো প্রার্থনা নেই। তবে আমার জীবনে এখন থেকে কিছু পরিবর্তন আসবে। শিষ্টতা ও সৌজন্য থাকবে। এটাই সেই মোড় বদল।’
১৯৭৪ সালে প্রকাশ হয় রুডলফ ওর্লিটজারের ‘কোয়েক’। উপন্যাসটি ১৯৬০–এর শেষভাগের হলিউডে রচিত—এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত শহরের পটভূমিতে উদ্ভট, স্বপ্নময় এক কাহিনী। এর বর্ণনা-রীতি, আগে থেকেই অনিশ্চিত। ভূমিকম্প-পরবর্তী বেঁচে থাকা মানুষদের কাছ থেকে পুরোপুরি হারিয়ে গেছে তা। ট্রপিকানা মোটেলের ধ্বংসস্তূপে এক ব্যক্তি আরেকজনকে বলে, ‘দিনটা দীর্ঘ হবে। কিন্তু যেহেতু এখনো মরিনি, বোধহয় আর মরবও না। আমি রক্তক্ষরণ করছি কিনা কে জানে। আমি এখানে অপেক্ষা করি। তুমি আমাকে ভুলে যাও, আর আমি তোমার পিছু নেব।’
স্পলডিং গ্রের ‘মনস্টার ইন আ বক্স’ অনেকটা মনোলগের মতো। ১৯৯০ সালে প্রকাশ হয় বইটি। ভূমিকম্পের পরের দৃশ্য বর্ণনা দিতে তিনি বলেন, ‘সম্পূর্ণ পাড়া গুঞ্জন করছে। সবাই কথা বলছে, কথা বলছে ভূমিকম্প নিয়ে…` তারপর সবাই ভূমিকম্প নিয়ে কথা বলা বন্ধ করে আবার তাদের সিনেমার স্ক্রিপ্ট নিয়ে কথা বলতে শুরু করল।’
ডেভিড ওয়ায়াট যুক্তি দেন যে আগুনই ক্যালিফোর্নিয়ার ইতিহাসের প্রধান সামাজিক-গঠনকারী শক্তি। ১৯৯৯ সালে প্রকাশ হয় তার ‘ফাইভ ফায়ার্স: রেস, ক্যাটাস্ট্রোফি, অ্যান্ড দ্য শেপিং অব ক্যালিফোর্নিয়া’। বইয়ে তিনি পাঁচটি বিশেষ ঘটনা অনুসরণ করেন, যার একটি ১৯০৬ সালের সান ফ্রান্সিসকো ভূমিকম্প ও অগ্নিকাণ্ড। তিনি লেখেন, ‘ভূমিকম্প ও আগুনের পর সান ফ্রান্সিসকো সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাটিকে কাহিনী থেকে মিথে রূপান্তর শুরু করল…` ভূমিকম্প ও অগ্নিকাণ্ড নিয়ে শহর যে গল্পটি নিজেকে বলেছিল, তা হলো এক শহরের গল্প, যে নিজের ধ্বংসের দিকে শীতল চোখে তাকিয়ে থাকে’
ভূমিকম্প নিয়ে সবচেয়ে বিখ্যাত বা আলোচিত বই হারুকি মুরাকামির ‘আফটার দ্য কোয়েক’। ছয়টি গল্প নিয়ে ২০০০ সালে প্রকাশ হয় বইটি। ১৯৯৫ সালের ১৭ জানুয়ারিতে সংঘটিত কোবে ভূমিকম্পের প্রতিক্রিয়ায় গল্পগুলো লেখা। এ ভূমিকম্পে ছয় হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়। ভূমিকম্প মূল প্রতিপাদ্য হলেও বইটি মূলত এর প্রতিক্রিয়া বা আফটারশক নিয়ে। ‘ইউএফও ইন কুশিরো’ গল্পে মুরাকামি লেখেন, ‘পাঁচ দিন সে টেলিভিশনের সামনে কাটাল—ধসে পড়া ব্যাংক আর হাসপাতাল, আগুনে জ্বলতে থাকা দোকানপাটের গোটা ব্লক, ভাঙা রেললাইন আর এক্সপ্রেসওয়ে—এসবের দিকে তাকিয়ে। সে কোনো কথা বলেনি। সোফার কুশনের মধ্যে ডুবে গিয়ে, মুখ শক্ত করে বন্ধ করে রেখেছিল; কোমুরা কথা বললে কোনো উত্তর দিত না। না মাথা নাড়ত, না ঝাঁকাত। কোমুরা নিশ্চিতও হতে পারছিল না, তার কণ্ঠের শব্দ আদৌ তার কাছে পৌঁছাচ্ছে কিনা।’
মূলত এ গল্পগুলোকে ভূমিকম্পে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের বাইরে গিয়ে মুরাকামি তাদের কথা বলেন যারা সেই ক্ষতিকে দেখেছে বাইরে থেকে কিন্তু ক্ষতি না হলেও তাদের মানস প্রভাবিত হয়েছে। ‘সুপার ফ্রগ সেভস টোকিও’ গল্পে দেখা যায় ব্যাংকের চাকুরে কাতাগিরিকে একটা ব্যাং বলছে সে ভূমিকম্প ঠেকাতে কাতাগিরিকে সাহায্য করবে। জাপানি মিথ ও লোককথার সঙ্গে ফিউশন করা এ গল্প সব পাঠকের কাছে পছন্দের নাও হতে পারে তবে ধরে নেয়া যায় সাধারণ, প্রকৃতির সঙ্গে লড়াইয়ে অক্ষম মানুষও যে লড়াই করতে চায় সে জায়গা থেকে গল্পটাকে দেখার সুযোগ আছে।

লরা ইমাই মেসিনা লিখেছেন ‘দ্য ফোন বুথ অ্যাট দ্য এজ অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’। ভূমিকম্প ও সুনামিতে ক্ষতিগ্রস্ত, শোকাহত মানুষও বেঁচে থাকে। সেই গল্পই বলেছেন লরা। এদিকে লিজা লোউইৎসের ‘আপ ফ্রম দ্য সি’তে দেখা যায় এক তরুণকে। ভূমিকম্পের পর সবকিছু হারিয়ে সে নতুন করে বাঁচতে চায়। নোরিকো হোরিয়ের ‘দ্য প্লেস অব সেলস’–এ তোহোকু সুনামির কথা এসেছে।
নেপালও ভূমিকম্প প্রবণ দেশ। ২০১৫ সালের ভূমিকম্প-পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে কবিতা লিখেছেন নেপালি কবি বিনা থিং তামাং। নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ ভূমিকম্প উঠে এসেছে চেসি হেনরির স্মৃতিকথা ‘উই ক্যান মেক আ লাইফ’–এ।
বাংলা সাহিত্যেও ভূমিকম্পের কথা এসেছে। তবে তা সামান্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মালঞ্চ’য় বিহার ও নেপালে ভূমিকম্পের প্রভাব পাওয়া যায়। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখাতেও ভূমিকম্পের প্রসঙ্গ আছে। সম্ভবত তিনি মুঙ্গের ছিলেন। বাংলাদেশে আবু ইসহাকের ছোটগল্প ‘ভূমিকম্প’ কথা বলে দুর্যোগের পর সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকা নিয়ে। মূলত দেশ বিদেশের সব ফিকশনেই ভূমিকম্পের ভয়াবহতার পাশাপাশি, ভূমিকম্প-পরবর্তী সময়ে টিকে থাকার মানসিক টানাপড়েন ও বাস্তবতাকেই তুলে ধরেছে।
ট্যাগ: #ইতিহাস