মাহমুদের মহাফেজখানা (Mahmud Writes) · সকল লেখা · বই

প্রেম যে শহরের বাতাসে ভাসে

লেখক: · ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ · বিভাগ: সিনেমা

sonam kapoor and abhishek bacchan in delhi-6

সিনেমায় দিল্লির বহু বছরের চর্চাকে তুলে ধরেছেন রাকেশ। মন্দিরের ঘণ্টা, আচার বানানো, ছাদে পায়রা ও ঘুড়ি ওড়ানো, জমি নিয়ে ভাইয়ের দ্বন্দ্ব, রাজনীতির মারপ্যাঁচ সবই এনেছেন তিনি। এসবের মধ্যে প্রেমকে তিনি হাজির করেছেন শহর ও মানবীরূপে। অ্যাশ কিংয়ের গলায় ‘দিল গিরা কাহি পার, দফফাতান’ যখন বাজে, রওশনের কাছে দিল্লি আর নিউইয়র্কের কোনো ভেদ থাকে না।

মানুষের বুকের মধ্যে হৃদয় ধকধক করে। শহরেরও থাকে প্রাণ। এ কারণেই আমরা দেখি, লেখা হয়, ‘শহরের প্রাণকেন্দ্র’। যেখানে বেশি মানুষের চলাচল, বেচাকেনা, হাটবাজার, আলোচনা, সভা-সমাবেশ—সেটাই শহরের প্রাণকেন্দ্র। আসলে শহরের প্রাণ হলো মানুষ। সে শহর হতে পারে ঢাকা, নিউইয়র্ক, লাহোর, লন্ডন ইস্তানবুল কিংবা দিল্লি। এ প্রতিটি শহরই মানুষকে নিয়ে ধুকপুক করে চলে। নিউইয়র্ক ও লন্ডন নিয়মমাফিক চলতে পারে; তবে ঢাকা, দিল্লির মতো শহরগুলো কোনো নিয়মে চলে না। এখানে জ্যাম, সেখানে সমাবেশ, সরু গলি আটকে রাখে গাড়ি কিংবা গরু। পানি সকালে আসে তো বিকালে নেই। এর জমি দখলে ব্যস্ত সে। কিন্তু তার মধ্যেই কোথায় যেন একটা পাগলামি থাকে, যা মানুষকে আটকে রাখে। সিনেমায় সে পাগলামির স্বরূপ ধরতে চেয়েছেন রাকেশ ওম প্রকাশ মেহরা।

দিল্লি-৬ থেকে আমেরিকা প্রবাসী হয়েছিলেন রওশনের বাবা। এক মুসলিম মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন তিনি। তারপর দীর্ঘ প্রবাস। নিয়ে গিয়েছিলেন মা অনুপমা মেহরাকেও। অসুস্থ অনুপমা শেষবার ফিরতে চান দিল্লি। তাকে সেখানে নিয়ে আসে নাতি রওশন। প্রথমে দিল্লির ধুলো, ট্র্যাফিক জ্যাম, সরু গলি আর মানুষের বোকাটে কাজকর্ম অপছন্দই করে রওশন। কিন্তু দিল্লির হাওয়া আর মানুষের পাগলামিতে এমন কিছু আছে, যাতে বাঁধা পড়ে যায় রওশন। সে আর ফিরতে চায় না আমেরিকায়। খুবই পরিচিত গল্প। এমন গল্পে বেশকিছু সিনেমা হয়েছে বলিউডে, কিন্তু রাকেশ ওম প্রকাশ মেহরার বিষয়বস্তু, গল্প বলার ধরন, প্রসুন যোশীর লিরিক ও এ আর রহমানের সংগীতে ভিন্নমাত্রা পায় দিল্লি সিক্স।

হাজার বছরের পুরনো শহর দিল্লি। তার গায়ে বহু সময়, বহু শাসক, বহু শাসিত, ধর্ম, গোত্র ও সম্প্রদায়ের ছাপ। বিষয়টি সবচেয়ে সুন্দর করে প্রকাশ করেছিলেন খুশবন্ত সিং, তার ‘দিল্লি’ উপন্যাসে। রাকেশ মেহরা পুরো দিল্লিকে আনেনি। একটা ছোট অংশ দিয়ে প্রকাশ করেছেন। গল্পে দেখা যায় দিল্লি ছয়ে পাশাপাশি বাস করে হিন্দু ও মুসলিম। তারা নিজ নিজ ধর্ম পালন করে। মামদোর জিলাপির দোকানে বসে অর্ধেক জীবন পার করে দিয়েছে জয় গোপাল। মামদো আবার বজরং বলির ভক্ত, সে আখড়ায় কুস্তিও করে। হাজি সাহেবের সঙ্গে লালারও ভালো সম্পর্ক। এদিকে অসুস্থ অনুপমা মাঝ রাস্তায় গরুর বাছুর হওয়া দেখতে গিয়ে গো মাতার আশীর্বাদ নেয়।

দিল্লি ছয়কে পরিচয় করাতে গিয়ে প্রসুন যোশী লিখেছেন—

ইয়ে দিল্লি হ্যাঁয় মেরে ইয়ার,
ব্যস ইশক মোহাব্বত পেয়ার

সেই প্রেম বা ভালোবাসার গল্পে পড়েই যান রাকেশ। রওশন প্রেমে পড়ে বিট্টুর। কিন্তু তার আগে আমরা দেখি দিল্লি সিক্সকে। এক এক করে সেখানকার বাড়ি, বাজার, মন্দির, মসজিদ ও মানুষকে পরিচয় করানো হয়। আর টাইটেল সঙ্গে প্রসুন আরো বলেন—

বুকে টেনে নেয় শক্ত করে
শোনায় হৃদয়ের ধুকপুকানি
এর বামে হৃদয় আছে, ডানেও
শহর না এটা, বড় এক জলসা

সত্যিই তাই। দিল্লি সিক্সে রওশন যখন আসে তখন দীপাবলির সময়। ময়দানে চলছে রামলীলা। এক একটি অংশ এক এক রাতে অভিনীত হয়। রাকেশ আমাদের দেখান একদিকে জামে মসজিদে জুমা হচ্ছে, অন্যদিকে রামলীলা চলছে। কারো সঙ্গে কারো বিরোধ নেই। তিনি এ গল্পে নিয়ে আসেন জালেবি নামের ‘অস্পৃশ্য’ এক নারীকে। তাকে ভুল করে ছুঁয়ে দিলেও প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। সে দৃশ্যের পরই রামলীলায় শবরী অধ্যায় দেখান রাকেশ। শবরীর এঁটো খাবার অবধি খেয়েছিলেন রাম। কিন্তু সে দৃশ্য দেখে গোবর বলে, ‘রাম তো ভগবান ছিলেন। তিনি সব পারেন।’

হাজার বছরের পুরনো শহর দিল্লি। তার গায়ে বহু সময়, বহু শাসক, বহু শাসিত, ধর্ম, গোত্র ও সম্প্রদায়ের ছাপ। বিষয়টি সবচেয়ে সুন্দর করে প্রকাশ করেছিলেন খুশবন্ত সিং, তার ‘দিল্লি’ উপন্যাসে। রাকেশ মেহরা পুরো দিল্লিকে আনেনি। একটা ছোট অংশ দিয়ে প্রকাশ করেছেন।

আধুনিক মনের রওশন এসব মানতে পারে না। একইভাবে সে মানতে পারে না জোর করে বিট্টুর বিয়ে দেয়া। কিন্তু দিল্লি ছয়ের পিতৃতান্ত্রিক পরিবারে নারীর ইচ্ছা-অনিচ্ছা, স্বপ্নের কোনো দাম নেই। বিট্টুর ইচ্ছার বিরুদ্ধেই তার বিয়ে ঠিক করে তার বাবা মদন গোপাল শর্মা। এদিকে রওশন টের পায় সে প্রেমে পড়েছে।

সুপ্রিয়া পাঠক, শীবা চাড্ডা, অদিতি রাও হায়দারী, ওয়াহিদা রহমান ও অভিষেক বচ্চন

এ সবকিছুর মধ্যে থাকে ‘কালা বান্দর’। এক অচেনা ভয়, যা দিল্লি ছয়ের অধিবাসীদের ভীত করেছে বহুদিন। সমস্যা হয় যখন সেই বান্দরকে খুঁজতে এসে শনি বাবা জানায় দরগাহর জায়গায় বহু বছর আগে মন্দির ছিল। সে মন্দির আবার স্থাপন করতে হবে। শুরু হয় বিভেদ। যারা পাশাপাশি গলাগলি করে বাস করছিল তারাই একে অন্যকে হত্যা করতে উদ্যত হয়। রওশন তখন বাঁদরের পোশাক পরে তাদের মাঝে গিয়ে সে সংঘাত থামায়। দুই পক্ষই এক হয়ে মারতে শুরু করে কালা বন্দরকে।

এ সিনেমায় দিল্লির বহু বছরের চর্চাকে তুলে ধরেছেন রাকেশ। মন্দিরের ঘণ্টা, আচার বানানো, ছাদে পায়রা ও ঘুড়ি ওড়ানো, জমি নিয়ে ভাইয়ের দ্বন্দ্ব, রাজনীতির মারপ্যাঁচ সবই এনেছেন তিনি। এসবের মধ্যে প্রেমকে তিনি হাজির করেছেন শহর ও মানবীরূপে। অ্যাশ কিংয়ের গলায় ‘দিল গিরা কাহি পার, দফফাতান’ যখন বাজে, রওশনের কাছে দিল্লি আর নিউইয়র্কের কোনো ভেদ থাকে না। রাকেশের সিনেমা তখন হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক। এ সিনেমায় সংগীত তাই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রামলীলার সংগীত থেকে এসেছে ‘আরজিয়া’র মতো দরগাহর গান। আছে র‍্যাপ, আছে আরতি। বড়ে গোলাম আলীর ‘ভোর ভায়ী’র সঙ্গে শ্রেয়া ঘোষালের ফিউশন করেছেন এআর রহমান।

অভিনেতাদের কথা আলাদা করে না বললেই না। বিট্টু চরিত্রে ছিলেন সোনম কাপুর, রওশন চরিত্রে অভিষেক বচ্চন, দাদি অনুপমার চরিত্রে ওয়াহিদা রহমান। তারা সবাই ভালো করেছেন। তবে এ সিনেমায় আলাদা করে নজর কাড়ের দীপক দোব্রিয়াল, অতুল কুলকার্নি ও বিজয় রাজ। বস্তুত, ‘দিল্লি সিক্স’-এ অভিনেতারা একটা প্রপসের অংশ, যেখানে মূল মঞ্চ দিল্লি ছয়।

কিন্তু দিল্লি সিক্সের মূল বার্তা সহাবস্থান। মামদো, গোবর, মদন গোপাল, জয়গোপাল, হাজি, লালা সবাই একত্রেই ছিলেন। একটা ভুল তাদের সংঘাতে নিয়ে যায়। মৃত্যুমুখী রওশনকে দেখে তাই গোবর বলে, ‘কালা বান্দর তো আমাদের ভেতরেই আছে।’ বোকা বলে পরিচিত গোবরের মুখ থেকেই সত্যটা বলিয়ে নেন রাকেশ। তখন সকালের আলো ফোটে। দিল্লি ছয়ের বাতাসে আবারো প্রেম ভাসে।

ট্যাগ: #সিনেমা

সম্পর্কিত লেখা