তেরে ইশক মে… যাব তাক হ্যাঁয় জান
লেখক: মাহমুদ (Mahmud) · ২৯ মার্চ, ২০২৬ · বিভাগ: সিনেমা
আনন্দ এল রাইয়ের 'তেরে ইশক মে...' সিনেমা ও যশ চোপড়ার 'যাব তাক হ্যাঁয় জান' কোথাও মিলে যায়। তাদের সঙ্গে মিলে যায় বলিউডের আরও অনেক সিনেমার প্রেমের গল্প।
লাদাখের মনোরম প্রকৃতি। তার মাঝে একাকী শাহরুখ খান। গায়ে আর্মি ইউনিফর্ম। নেমট্যাগে লেখা সমর আনন্দ। তিনি বোমা নিষ্ক্রিয় করেন। তার মতো করে এই কাজে এক্সপার্ট আর কেউ নেই। রোজ মৃত্যুর কাছাকাছি গিয়ে আবার ফিরে আসেন। মৃত্যু তাকে নেয় না। কিন্তু এই মৃত্যু আকাঙ্খার পেছনে আছে ভাঙা প্রেমের দহন। এরকমই গল্প নিয়ে যশ চোপড়ার ‘যাব তাক হ্যাঁয় জান’। প্রায় একই রকম দৃশ্যায়ন আমরা দেখি আনন্দ এল রাই পরিচালিত সদ্য মুক্তি পাওয়া ‘তেরে ইশক মে’ সিনেমায়। শুরুতেই শঙ্কররূপী ধানুশকে দেখা যায় বিমান বাহিনীর তেজাস চালাতে। তিনি কমান্ড মানেন না। নিজের মতো বিমান চালিয়ে যান। আমরা টের পাই, বেপরোয়া এই অ্যাকশনের পেছনে আছে কোনো দহন।
দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের মধ্যে নস্টালজিয়ার প্রবণতা বেশি। সেই কারণেই ১২ বছর আগের ‘রানঝানা’ নিয়ে আমাদের আবেগের পরিমাণও বেশি। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, সিনেমা হিসেবে ‘রানঝানা’ উঁচু মানের। বলিউডে গত ১২ বছরে খুব কম সিনেমাই তার কাছাকাছি গেছে। হয়ত সেই কারণে, কিংবা সত্যিই নির্মাতা আনন্দ এল রাই রানঝানা থেকে বের হতে পারেননি। ১২ বছর পর তিনি আরেকটি সিনেমা নির্মাণ করার আগেই সেটাকে রানঝানার স্পিরিচুয়াল সিকুয়াল বলেন এবং সিনেমায় সেটা প্রমাণিত হলেও লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো ‘তেরে ইশক মে’র মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় যশ চোপড়ার ‘যাব তাক হ্যাঁয় জান’। অন্যদিকে, এই সময়ে বলিউড যখন ক্রমাগত ভায়োলেন্সের দিকে হাঁটছে, রাই সেখানে বেশ ভালোভাবে বলিউড রোমান্স আর ভায়োলেন্স ব্যালেন্স করেছেন।
বলিউড রোমান্সের একটা ধারা আছে। যদিও মনমোহন দেশাইয়ে এক ধারা, যশ চোপড়ার এক ধারার আবার করণ জোহরের ধারা সেখান থেকে ভিন্ন। ভায়োলেন্সের ক্ষেত্রে প্রশান্ত নীল আর সন্দ্বীপ রেড্ডি ভাংগাও ভিন্ন। এরা দক্ষিণের নির্মাতা তবে নাম নেয়া হলো কারণ দক্ষিণ এখন বলিউডের ওপর ভর করেছে। ভাংগায় অর্জুন রেড্ডি বলিউডে কবির সিং হয়ে যায়। তার অ্যানিমেলকে অ্যাকশন সিনেমা বা সাইকো-ভায়োলেন্স হিসেবে না দেখে দর্শক রোমান্টিক পয়েন্ট অব ভিউ থেকে দেখেন। কিন্তু মনমোহন, যশ, করণ হোক বা সঞ্জয় লীলা বানসালি। বলিউডে রোমান্স ও রোমান্টিক ভায়োলেন্স যারা তৈরি করেছেন তাদের সিনেমার নায়কের মধ্যে প্রেমের দহন যখন সহিংস হয় তার একটা সাধারণ-পরিচিত ধারা আছে। রাই সে ধারাতেই গেছেন ‘তেরে ইশক মে’ সিনেমায়।

এ সিনেমার একটি নিজস্ব গল্প আছে। দিল্লির পটভূমির এই গল্পে শঙ্কর একজন কলেজ স্টুডেন্ট। রাজনীতি করে। ফলে সে ‘রাউডি’। অন্যদিকে মুক্তি সাইকোলজি নিয়ে পড়শোনা করছে। তার ডক্টরাল থিসিসের বিষয় ‘মানুষের মধ্য থেকে ভায়োলেন্স চিরতরে বাদ দেয়া সম্ভব’। সেটা শিক্ষকদের কাছে প্রমাণ করার জন্য বেছে নেয় শঙ্করকে। আর এই যাত্র্রায় শঙ্কর তার প্রেমে পড়ে। কিন্তু শঙ্করকে মুক্তি ভালোবাসে না।
এ সিনেমার একটি নিজস্ব গল্প আছে। দিল্লির পটভূমির এই গল্পে শঙ্কর একজন কলেজ স্টুডেন্ট। রাজনীতি করে। ফলে সে ‘রাউডি’। অন্যদিকে মুক্তি সাইকোলজি নিয়ে পড়শোনা করছে। তার ডক্টরাল থিসিসের বিষয় ‘মানুষের মধ্য থেকে ভায়োলেন্স চিরতরে বাদ দেয়া সম্ভব’। সেটা শিক্ষকদের কাছে প্রমাণ করার জন্য বেছে নেয় শঙ্করকে। আর এই যাত্র্রায় শঙ্কর তার প্রেমে পড়ে। কিন্তু শঙ্করকে মুক্তি ভালোবাসে না। তার সামাজিক বা অর্থনৈতিক অবস্থা না, শঙ্করের প্রতি মুক্তির কোনো অনুভূতি কখনো তৈরি হয় না। যদিও সিনেমা দেখে আমরা বুঝি সে শঙ্করকে কখনো না কখনো ভালোবেসেছে। সেইসব কারণে শঙ্কর আবারো ভায়োলেন্ট হয়। তাকে জেলে যেতে হয়। তার বাবা তাকে ছাড়িয়ে আনে। বাবার মৃত্যু হয়, মুক্তির বিয়ে হয় কিন্তু শঙ্করের দহন কমে না।

যশ চোপড়ার ‘ডর’ সিনেমায় আমরা শাহরুখ খানকে ভায়োলেন্ট হতে দেখেছি। তবে তিনি প্রেয়সীর প্রতি সহিংস না। তার সহিংসতা কিছুটা অভ্যন্তরীণ আর প্রেয়সীর প্রেমিকের প্রতি। কবির সিং, অর্জুন রেড্ডি বা অ্যানিম্যালের নায়ক সবার প্রতিই সহিংস। তার দহনের কারণ প্রেম না কিন্তু সেসব বিষয়কে প্রেমের সঙ্গে যোগ করা হয়। এই প্রসঙ্গে আনা যায় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত ‘দেবদাস’ উপন্যাসকে। দেবদাসও ছিল ভায়োলেন্ট তবে তিনি ছিলেন সেল্ফ ডেসট্রাকটিভ। শঙ্করও অনেকটা তাই। রানঝানার কুন্দনও সেল্ফ ড্রেসট্রাকশনে চলে গিয়েছিল তবে তার কোনো বাহ্যিক ভায়োলেন্স ছিল না।
‘তেরে ইশক মে’কে ‘যাব তাক হ্যাঁয় জান’-এর সঙ্গে তুলনা করার বেশকিছু কারণ আছে। সিনেমাটিতে সমরকে মীরা যদিও ভালোবাসে, ঈশ্বরের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত লেনদেনের কারণে সে সমরকে ছেড়ে চলে যায়। এখানেও মুক্তির বিষয়টা খানিক সে রকম। তবে সে নিজের সিদ্ধান্তে শঙ্করকে ধরা দেয় না। কিন্তু বেশকিছু কারণে যাব তাক হ্যাঁয় জান একালের দর্শক পছন্দ করবেন, যেসব করাণে তেরে ইশক মে পছন্দ করবেন না।

পৌরুষের নানা রকম উপস্থাপন নানা সময়ে হয়। এই সময়ে এসে ভায়োলেন্ট পুরুষ সার্বিকভাবে পছন্দ করেন না নতুন প্রজন্মের দর্শক। তারা তুলনামূলক ফেমিনিন পুরুষ পছন্দ করেন। কবির সিংয়ের মতো পুরুষদেরকে কিছু পুরুষ স্ক্রিনে দেখতে পছন্দ করেন কিন্তু নারীরা একেবারেই পছন্দ করেন না। অবশ্য রণবিজয়কে (অ্যানিম্যাল) অপছন্দ করার বহু কারণ থাকলেও পছন্দ করেন। এর অন্যতম কারণ হতে পারে রণবিজয়ের আর্থ-সামাজিক অবস্থান। এই সবকিছুর বাইরে গিয়ে, এক নারীর প্রেমে পড়ে থাকা কুন্দনকে (রানঝানা) পছন্দ করা যেতে পারে কিন্তু এক নারীর প্রণয়ে থাকার পরও তাকে শেষ পর্যন্ত গ্রহণ না করার (যেখানে সেই নারীই এক সময় তাকে গ্রহণ করেনি) বিষয়টা দর্শক পছন্দ করবেন না।
এখানেই ভিন্নতা রাইয়ের নায়কের সঙ্গে যশের নায়কের। সমর আনন্দ সব ছেড়ে বম্ব ডিসপোজাল স্কোয়াডে ঢুকে যায়। সে প্রতিদিন মীরার প্রেমে থেকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করে। তার জীবনে আকিরা (আনুশকা শর্মা) আসে কিন্তু তাকে সে প্রথমে গ্রহণ না করলেও আকিরার সঙ্গে সমরের বন্ধুত্ব হয়ে যায়। সমরের প্রেম, বন্ধুত্ব আর দেশপ্রেম বা আর্মির দায়িত্বের বিষয়টা যশ চোপড়া যেভাবে দেখিয়েছেন তা অন্য কেনো নির্মাতার পক্ষে সম্ভব না। যশের নায়ক নিজের প্রেমের দহনে নিজেই থাকে, সে শহর পোড়ায় না বা নায়িকার গায়ে হাত তোলে না। দর্শক তার এই দহনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে। যারা যুক্ত করতে পারে না তারাও সমরকে অপছন্দ করে না। শেষ অবধি সমালোচনা হয় সিনেমায় সমরের একাধিক দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত পাওয়া নিয়ে, সমরের প্রেম নিয়ে না।

কিন্তু তেরে ইশক মে দেখতে গেলে অনেক সময়ই মনে হবে শঙ্কর তার প্রেমে জেদ করছে। যে প্রেম সে পাবে না সেটাকে জোর করে পেতে চায়। একই কাজ কুন্দনও করেছিল কিন্তু কুন্দন সেই প্রেমের জন্য কারো বাহ্যিক ক্ষতি করেনি। এই সবকিছুর মধ্যে আনন্দ এল রাইয়ের প্রতি দর্শকের ক্ষোভ আসবে। মনে হবে তিনি একটা গল্প বলতে গিয়ে মাঝপথে সেই গল্প থেকে দূরে সরে গেছেন। বিমানবাহিনীকে তিনি এনেছেন কেবল পাবলিক সিমপ্যাথি ও বৃহত্তর দর্শককে জাতীয়তাবাদি চেতনা দিয়ে সিনেমার ব্যবসা করার জন্য। কিন্তু বস্তুত রোমান্টিক সিনেমার এই ধারাতে যশ চোপড়া অনেক আগেই ইউনিফর্ম এনেছিলেন। সিলসিলাতেও আমরা সেই সিলসিলা দেখেছি।
তবে রাই যে এ সিনেমায় শাহরুখ খানকে ট্রিবিউট দিয়েছেন তা স্পষ্ট। শঙ্কর জেলে থাকার দৃশ্যে সে বন্ধুকে কাভি খুশি কাভি গমের কথা বলে। আর প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আর্মি জয়েন করার বিষয়টা তো স্পষ্টতই যাব তাক হ্যাঁয় জান মনে করিয়ে দেয়। তবে পার্থক্য এখানেই যে, যাক তাক হ্যাঁয় জানের শেষে মীরার ফিরে আসার পরও প্রেমিকের দহন স্পষ্ট কিন্তু তেজাস নিয়ে শত্রুর জাহাজের দিকে চলে যাওয়ার সময় শঙ্করের প্রেমের চেয়ে জেদ বড় হয়ে ওঠে। কিছুটা খেলোও।

রানঝানার কুন্দন বহু প্রেমিকের পাশাপাশি বহু প্রেমিকারও মন জয় করেছিল। শঙ্কর তা পারবে না। তবুও এই সিনেমাকে রানঝানার সঙ্গে যুক্ত করা যায়। আনন্দ অবশ্য সরাসরিই যুক্ত করেছেন মুরারির ক্যামিও রেখে। বেনারসে বাবার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য যায় শঙ্কর। সেখানে তাকে দেখে মুরারি আনমনেই বলে ওঠে, ‘সব প্রেমিকের কি একই চেহারা হয়?’
দহন সহ্য করা প্রেমিকদের চেহারায় মিল থাকতে পারে তবে সেইসব গল্প কথকদের পার্থক্য থাকে। তাই গল্প ভিন্নভাবে ধরা দেয়। কুন্দন আর শঙ্কর তাই এক কাতারে বসে না। যেমন বসে না রাহুল (ডর) ও সমর। তবে তেরে ইশক মে দেখার পর মনে হবে রাহুল আর শঙ্করও এক কাতারে বসতে পারে না।