মাহমুদের মহাফেজখানা (Mahmud Writes) · সকল লেখা · বই

সব সিংহাসনই রক্ত চায়

লেখক: · ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ · বিভাগ: সিনেমা

pankaj tripathi in Mirzapur

২০১৮ সালে মুক্তি পায় মির্জাপুর। ভারতীয় ওয়েব সিরিজের ধারা নির্ধারণ করেছিল ঐ বছর মুক্তি পাওয়া সেক্রেড গেমস ও মির্জাপুর। সিরিজের প্লটেই নির্মিত হয়েছে সিনেমা। তবে মূল বিষয়গুলো ঠিক রেখে গল্পটি ভিন্ন এক শাখায় বয়ে গেছে। গল্প বলার ক্ষেত্রে লিনিয়ার ন্যারেটিভেই থেকেছেন নির্মাতা। বেশি জটিল করতে চাননি। চরিত্রদের আন্তসম্পর্ক আগেই প্রতিষ্ঠিত থাকায় চরিত্র ও তাদের সম্পর্ক বিকাশের জন্য আলাদা সময়েরও প্রয়োজন ছিল না। সেদিক থেকে প্রায় তিন ঘন্টার সিনেমায় মূল গল্পটা তুলে এনেছেন তারা।

মানুষ বরাবরই ক্ষমতালিপ্সু। আর যারা একবার ক্ষমতা পায় তারা তা রক্ষা করার জন্য যে কোনো মাত্রায় পৌঁছতে পারে। আদতে ক্ষমতা দখলের চেয়ে ধরে রাখা কঠিন। একবার তীব্র আঘাত করে হয়ত ক্ষমতা দখল করা যায়। কিন্তু তা ধরে রাখার জন্য প্রতিনিয়ত আঘাত মোকাবেলা করতে হয়, অন্যকে আঘাত করতে হয়, জানতে হয় শত্রু ও বন্ধুর পরবর্তী পদক্ষেপ। এতোকিছুর পরও সিংহাসনের জন্য ঝড়াতে হয় রক্ত। সিংহাসন পাওয়ার জন্য যেমন তা করতে হয়, রক্ষা করার জন্যও করতে হয়। কেননা সিংহাসনের সঙ্গেই থাকে ক্ষমতা, অর্থ ও সম্ভাবনার সুতো। টানটান সুতোয় একবার ঢিল পড়লেই বিপদ। ক্ষমতার এই সূত্রই বারবার বলে গেছে মির্জাপুর। সিরিজের পর, গুরমিত সিং তার সিনেমাতেও নতুন করে সে কথাই স্মরণ করালেন।

২০১৮ সালে মুক্তি পায় মির্জাপুর। ভারতীয় ওয়েব সিরিজের ধারা নির্ধারণ করেছিল ঐ বছর মুক্তি পাওয়া সেক্রেড গেমস ও মির্জাপুর। সেক্রেড গেমস দুই সিজনে শেষ হলেও মির্জাপুর তিন সিজন টেনেছে। আরো একটি আসন্ন। এর মধ্যে আবার প্রযোজকরা সিদ্ধান্ত নেন সিনেমা করার। অনেকেরই সন্দেহ ছিল সিরিজের পর সিনেমায় কী থাকবে, কতটা থাকবে, কিংবা সিরিজের রেশ সিনেমায় রাখা সম্ভব হবে কিনা। সেই সব প্রশ্ন উড়ে গিয়েছিল ‘মির্জাপুর: দ্য মুভি’র ট্রেলারে। গুরমিত তার সিরিজের ‘টোন’ নষ্ট করেননি তা ট্রেলারই স্পষ্ট করেছিল। সিনেমা মুক্তির পরও দর্শকের প্রতিক্রিয়ায় এর প্রমাণ পাওয়া গেছে।

গল্পের গতি ও প্রকৃতি বিচারে বলা যায় ‘মির্জাপুর: দ্য মুভি’ আসলে বড় পর্দায় ‘মির্জাপুর’ সিরিজের স্পিন অফ। সিনেমার গল্প শুরু হয় সিরিজের একটা সময়ের (দ্বিতীয় সিজনের মাঝামাঝি কোনো সময়) পর থেকে।

সিরিজের প্লটেই নির্মিত হয়েছে সিনেমা। তবে মূল বিষয়গুলো ঠিক রেখে গল্পটি ভিন্ন এক শাখায় বয়ে গেছে। মির্জাপুর সিরিজের গল্প আখান্দা ও মুন্না ত্রিপাঠীর সাম্রাজ্য গুড্ডুর কাছে যাওয়ার—যেখানে আশপাশের অন্যান্য শক্তি মির্জাপুরের দখল চায়। সে যাত্রায় দুই দলেরই অনেক জানমালের ক্ষয়ক্ষতি থাকে। অন্যদিকে সিনেমার গল্পে আখান্দা ও ত্রিপাঠী পরিবারের প্রতি বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও শক্তির শত্রুতা দেখা যায়। কিন্তু এখানে গুড্ডু তাদের প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে না। সেও মির্জাপুরের বৃহত্তর শক্তির সঙ্গেই থাকে।

গল্পের গতি ও প্রকৃতি বিচারে বলা যায় ‘মির্জাপুর: দ্য মুভি’ আসলে বড় পর্দায় ‘মির্জাপুর’ সিরিজের স্পিন অফ। সিনেমার গল্প শুরু হয় সিরিজের একটা সময়ের (দ্বিতীয় সিজনের মাঝামাঝি কোনো সময়) পর থেকে। এখানে সুইটির সঙ্গে গুড্ডুর প্রেম আছে, মুন্না সুইটিকে চায়। বীণা নানাভাবে বিপথে চালাতে চায় মুন্নাকে। কালিন ভাইয়া (আখান্দা ত্রিপাঠী) তার সাম্রাজ্য মুন্নাকে দিতে চায়। তার সাম্রাজ্য চালানোর অন্যতম দুই সেনাপতি হয়ে উঠেছে গুড্ডু ও বাবলু। জৌনপুরের সঙ্গে তার শত্রুতাও আছে। এই সবই সিরিজের গল্প। সিনেমায় নতুন সংযুক্তি এক উচ্চাভিলাষী সন্ত্রাসী ও ব্যবসায়ী বব্বন বাবুয়া। রাজস্থানের এই মাদক ব্যবসায়ীর লক্ষ্য মির্জাপুরের সিংহাসন দখল করা। সে রাজস্থান থেকে একজনের মাদক চুরি করে তা বিক্রি করার চেষ্টা করে। এদিকে মির্জাপুরের সিংহাসন দখল করতে সে সাহায্য নেয় রাজনীতিবিদন জেপি যাদবের—যার সঙ্গে ত্রিপাঠী পরিবারের সুসম্পর্ক। এদিকে বব্বন নিজের দলে টানে জৌনপুরের বাহুবলী রতিকান্ত শুক্লাকেও। গোপন উদ্দেশ্য, মির্জাপুর দখল করার পর রতিকান্তকেও সরিয়ে দিয়ে জৌনপুর দখল করা। বাস্তবে তা কখনো সম্ভব হলেও সিনেমার গল্পে এমনটা সম্ভব হয় না।

সিনেমায়ও আছে মুন্না ও গুড্ডুর দ্বৈরথ। ছবি: এক্সেল এন্টারটেইনমেন্ট

সিরিজের পুরনো কাস্ট নিয়েই ‘মির্জাপুর: দ্য মুভি’ নির্মাণ করেছেন গুরমিত। কেবল বদলেছে বাবলু পন্ডিতের কাস্টিং—বিক্রান্ত ম্যাসির চরিত্রটি এবার করেছেন জীতেন্দ্র কুমার। ভালোই করেছেন। অন্যান্য চরিত্রে পুরনো সবাই আগের মতোই। গুড্ডু চরিত্রে আলী ফজল, মুন্না চরিত্রে দিব্যেন্দু, বাবুজি চরিত্রে কুলভূষণ খারবান্দা, বীণা চরিত্রে রসিকা দুগাল আগের মতোই ভালো করেছেন। এবারো ‘বড় বাপের বখাটে ছেলে’র চরিত্রে মুন্না হিসেবে দিব্যেন্দুকে দেখে দর্শক আনন্দ পাবেন। গুড্ডু আগের মতোই বুদ্ধির চেয়ে শক্তিতে বিশ্বাসী। সবাই সবার পুরনো চরিত্রের পরিচিত ধারাকেই এনেছেন।

এই সিনেমায় আছে মির্জাপুর বা সিংহাসনের সেই পুরনো লোভের গল্প। এই গল্প দেখতে দর্শক কখনোই বিরক্ত হয় না। গল্পটা কেবল একটু ভিন্নভাবে উপস্থাপন করতে হয়

নতুন সংযুক্তি বব্বন চরিত্রে রবি কিষণ চমৎকার। তার নিষ্ঠুর নির্মম আচরণ, সংলাপ ও অভিব্যক্তি তাকে কালিন ভাইয়ার উপযুক্ত শত্রু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। তবে কালিন ভাইয়া চরিত্রে পঙ্কজ ত্রিপাঠী এবারো ভালো করলেও কিছু জায়গায় তার শরীরী অভিব্যক্তি দেখে মনে হয় পুনরাবৃত্তির বিরক্তি লুকাতে পারছেন না।

গল্প বলার ক্ষেত্রে লিনিয়ার ন্যারেটিভেই থেকেছেন নির্মাতা। বেশি জটিল করতে চাননি। চরিত্রদের আন্তসম্পর্ক আগেই প্রতিষ্ঠিত থাকায় চরিত্র ও তাদের সম্পর্ক বিকাশের জন্য আলাদা সময়েরও প্রয়োজন ছিল না। সেদিক থেকে প্রায় তিন ঘন্টার সিনেমায় মূল গল্পটা তুলে এনেছেন তারা। তবে এই সিনেমায় মনে রাখার মতো, আসন থেকে উঠে দাঁড়ানোর মতো কোনো দৃশ্য নেই। মির্জাপুর সিরিজের শক্তি ছিল এর র’ সংলাপ, এখানে তা নেই।

আছে মির্জাপুর বা সিংহাসনের সেই পুরনো লোভের গল্প। এই গল্প দেখতে দর্শক কখনোই বিরক্ত হয় না। গল্পটা কেবল একটু ভিন্নভাবে উপস্থাপন করতে হয়। তবে রক্ত ঝরানোর উপাদান থাকতে হয়। ‘মির্জাপুর: দ্য মুভি’তেও তাই রক্ত ঝরে। আবারো বুঝিয়ে দেয়, সব সিংহাসনই রক্ত চায়।

ট্যাগ: #সিনেমা

সম্পর্কিত লেখা