মাহমুদের মহাফেজখানা (Mahmud Writes) · সকল লেখা · বই

‘স্যার, আমি আপনার ছাত্র ছিলাম। আমাকে কি মনে আছে?’

লেখক: · ২ জুন, ২০২৬ · বিভাগ: সিনেমা

ritwik ghatak

ঋত্বিক ঘটককে নিয়ে তার পরবর্তী সময়ের অনেক পরিচালক অনেককিছু লিখেছেন। সম্প্রতি ‘দ্য হিন্দু’তে প্রকাশিত আদুর গোপালকৃষ্ণণের একটি লেখা চোখে পড়ে। বর্তমান লেখাটি তারই অনুবাদ। উল্লেখ্য, আদুর গোপালকৃষ্ণন একজন মালয়ালম চলচ্চিত্র নির্মাতা। তিনি ভারতীয় ফিল্ম ইনস্টিটিউটে ঋত্বিক ঘটকের ছাত্র ছিলেন

বাংলা চলচ্চিত্রের মহান ত্রয়ীর মধ্যে ঋত্বিক ঘটক ছিলেন সবচেয়ে কনিষ্ঠ। অন্য দুজন হলেন সত্যজিৎ রায় ও মৃণাল সেন। তিনি [ঋত্বিক] স্বল্পায়ু হলেও বেপরোয়া এক জীবন যাপন করেছিলেন। নিজেকে জ্বালিয়ে শেষ করেছিলেন যেন। সিনেমার প্রতি তার আবেগ ও প্রতিশ্রুতি যেমন তীব্র ছিল, তেমনই ছিল তার রাজনৈতিক বিশ্বাস। তার ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধারাও তার অতিবিপ্লবী ভাবনাকে ধারণ করতে পারেননি। আর শেষ পর্যন্ত তাকে একাই নিজের মতাদর্শের পথে এগোতে হয়েছিল।

ঋত্বিক ঘটক ছিলেন জন্মগতভাবেই এক বিদ্রোহী। ভারতীয় সিনেমার ‘এনফাঁ টেরিবল’ হিসেবেই তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন। তার জীবন ও কাজের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই তিনি তুলনামূলকভাবে অল্প বয়সেই (পঞ্চাশের গোড়াতেই) মৃত্যুবরণ করেন। তার জীবন ও অবদান ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র—তার কোনও তুলনা নেই। তার কোনও প্রতিদ্বন্দ্বীও ছিল না, এমনকি অনুকরণকারীও নয়।

‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ (১৯৫৮) দিয়ে শুরু করে প্রতিটি চলচ্চিত্র ছিল তার আপসহীন মনোভাব ও নিরন্তর সংগ্রামের সাক্ষ্য। ১৯৬৩ সালে আমি ফিল্ম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ায় দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। তখন তিনি ভাইস প্রিন্সিপাল ও চলচ্চিত্র পরিচালনার অধ্যাপক হিসেবে আমাদের সঙ্গে যোগ দেন। তার থিয়েটার ও সিনেমা-জীবনের নানা অসাধারণ কাহিনি আমরা আগে থেকেই শুনেছিলাম। গভীর শ্রদ্ধা ও বিস্ময়ে ভরে ছিলাম। স্বাভাবিকভাবেই, আমরা তার সিনেমা দেখা ও কথা শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম। যখন সেই সুযোগ এল, আমরা রোমাঞ্চিত, উৎফুল্ল ও অনুপ্রাণিত হলাম।

নিজের চলচ্চিত্র নিয়ে কথা বলতে তিনি কখনও পিছপা হননি। তিনি আমাদের বোঝাতেন কেন তিনি সেই ‘ইমাজিনারি লাইন’ ভেঙেছেন, যা চরিত্রদের দৃষ্টির দিক ঠিক রাখতে সাহায্য করে। তার কাছ থেকেই আমরা শিখেছিলাম কীভাবে শব্দ একটি দৃশ্যের প্রভাব বাড়াতে পারে এবং দর্শকের উপলব্ধিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। চলচ্চিত্র নির্মাণে আপসহীন ও আবেগপূর্ণ তার বিস্তৃত ও গভীর আলোচনায় প্রকাশ পেত। এগুলো ছিল আমাদের ছাত্রজীবনের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও মূল্যবান শিক্ষা।

স্প্যানিশ-মেক্সিকান চলচ্চিত্রকার লুইস বুনুয়েল ছিলেন ঘটকের প্রিয়। বুনুয়েল পরিচালিত ১৯৫৯ সালের সিনেমা ‘নাজারিন’-এর ভক্ত ছিলেন ঋত্বিক। সুইডিশ পরিচালক ইঙ্গমার বার্গম্যানকে তিনি বিশেষ পছন্দ করতেন না।

একবার তিনি ক্লাসে সত্যজিৎ রায়ের ‘অপরাজিত’ প্রদর্শন করে কিছু দৃশ্য দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘এই হল মহান সিনেমা!’ এতে আমাদের ভ্রান্ত ধারণা ভেঙে যায় যে রায় ও ঘটক নাকি পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। আসলে তারা একে অপরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।

একটি গোপন তথ্য ছিল যে তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে ঋত্বিক ঘটকের নাম সুপারিশ করেছিলেন স্বয়ং সত্যজিৎ রায়। সত্যজিৎ একবার আমাকে বলেছিলেন, ‘ঋত্বিক ঘটকের শিরায়-উপশিরায় সিনেমা প্রবাহিত হয়।’ এমন একজন মানুষের কাছ থেকে এটি ছিল বিরাট প্রশংসা, যাকে অন্যায়ভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখানো হতো।

এই প্রসঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের বলা একটি বেদনাদায়ক ঘটনার কথা মনে পড়ে। ঘটকের মৃত্যুর খবর পেয়ে রায় কলকাতার হাসপাতালে তার শেষ শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সময় কয়েকজন তরুণ তাকে আঙুল তুলে বলেছিল, ‘আপনিই তাকে মেরেছেন।’

বেদ ও ভারতীয় সংস্কৃতি-ঐতিহ্য সম্পর্কে ঘটকের গভীর জ্ঞান আমাদের অনেককে মুগ্ধ করেছিল। বাংলার দেশভাগ এবং তার ফলে সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয় তার চলচ্চিত্রে বারবার ফিরে এসেছে।

আদুর গোপালকৃষ্ণন। ছবি: ইন্ডিয়া টুডে

সাধারণ মানুষ প্রায়ই তাকে মদ্যপানের সঙ্গে যুক্ত করত। কিন্তু কখনও তাকে মদ্যপ অবস্থায় ক্লাসে আসতে দেখা যায়নি। তার হাতে সবসময় নতুন বই দেখে আমি মুগ্ধ হতাম।

ঘটকের চলচ্চিত্রচর্চা ছিল তার অদ্ভুত আকর্ষণ, ধারণাগত মৌলিকতা, অপ্রতিরোধ্য সৃজনশীল শক্তি এবং দৈনন্দিন জীবনের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণে ভরপুর। ‘মাতৃভাবনা’ তার কাজে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে উপস্থিত ছিল।

মেলোড্রামাকে উচ্চ শিল্পে রূপান্তর করার বিরল ক্ষমতাই ছিল তার বিশেষত্ব। দৃশ্য ও শব্দ ব্যবহারে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নতা ছিল ঋত্বিকের কাজে। থিয়েটার থেকে নেওয়া কিছু কৌশল তিনি এমনভাবে ব্যবহার করতেন, যা সিনেমায় আগে দেখা যায়নি। যেখানে সাধারণত একটি দৃশ্য স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী সরলভাবে চিত্রায়িত হয়, সেখানে ঘটক তা ভেঙে নতুনভাবে উপস্থাপন করতেন—অপ্রচলিত অ্যাঙ্গেল, লেন্স, আলো, কম্পোজিশন এবং বিশেষ করে জাম্প-কাট ব্যবহার করে।

শব্দও তার চলচ্চিত্রে ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু পরিবেশ বোঝাতে নয়, নাটকীয় প্রভাব সৃষ্টিতেও শব্দ ব্যবহৃত হতো। তার সাউন্ডট্র্যাক ছিল বহুস্তরীয়। সংগীত, সংলাপ ও প্রতীকী শব্দের সমন্বয়ে দৃশ্যের গভীরতা বাড়াতো। তিনি নিজেই তার স্বতন্ত্র সংগীত রচনা করতেন।

ঋত্বিক ঘটকের আটটি ছবির মধ্যে আমার প্রিয় ‘মেঘে ঢাকা তারা’ (১৯৬০), ‘সুবর্ণরেখা’ (১৯৬৫) এবং ‘অযান্ত্রিক’ (১৯৫৮)।

বিমল রায়ের ১৯৫৮ সালের ‘মধুমতি’র গল্প ও চিত্রনাট্য লিখেছিলেন ঋত্বিক ঘটক। হিন্দি সিনেমার এক অনন্য ক্লাসিক মধুমতি। গল্প, বিশেষ করে শেষের মোচড়, অভিনয়, গান, প্রেম ও ট্র্যাজেডি মিলিয়ে এটি ছিল এক অসাধারণ সৃষ্টি।

পুরনো দিনের কথা মনে করলে বুঝতে পারি, একজন ভক্ত হিসেবে ঘটকের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি হয়নি। ক্লাসের বাইরে তার সঙ্গে আমার কখনও দেখা হয়নি। হয়তো আমি অতিরিক্ত লাজুক ছিলাম বলেই। তবে আমার জুনিয়রদের মধ্যে মণি কওল ও কুমার সাহনি তার ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং নিজেদের তার ‘শিষ্য’ ও ‘অনুসারী’ বলে মনে করতেন।

অদ্ভুত হলেও সত্য, ঘটকের জীবদ্দশায় তার কোনো সিনেমাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়নি। এমনকি তিনি বিদেশেও যাননি। তবে তার মৃত্যুর পর বিশ্বের নানা চলচ্চিত্র উৎসবে তার ছবির পুনর্মূল্যায়ন শুরু হয়।

ইনস্টিটিউট থেকে পাশ করার এক দশক পরে, দিল্লির এক চলচ্চিত্র উৎসবে তাঁর সঙ্গে একই মঞ্চে থাকার সুযোগ হয়েছিল। আমি তাকে প্রণাম জানাতে এগিয়ে গিয়ে বললাম, ‘স্যার, আমি আপনার ছাত্র ছিলাম। আমাকে কি মনে আছে?’
তিনি অস্পষ্ট দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ‘না।’

আদুর গোপালকৃষ্ণন: মালয়ালম নির্মাতা। ভারতের ফিল্ম ইনস্টিটিউটে ঋত্বিক ঘটকের ছাত্র।

সম্পর্কিত লেখা