মাহমুদের মহাফেজখানা (Mahmud Writes) · সকল লেখা · বই

সিনেমার জিন্নাহর মনোকল পেয়েছিলেন আলেক পদমসি

লেখক: · ২১ জুন, ২০২৬ · বিভাগ: সিনেমা

Alyque Padamsee as Jinnah

রিচার্ড অ্যাটেনবরো পরিচালিত সিনেমা ‘গান্ধী’। এতে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন আলেক পদমসি। তিনি নিজে একজন বিজ্ঞপন নির্মাতা ও থিয়েটার ব্যক্তিত্ব ছিলেন। গান্ধী সিনেমায় অভিনয়ের অভিজ্ঞতা তিনি জানিয়েছেন তার আত্মজীবনীতে।

রিচার্ড অ্যাটেনবরো পরিচালিত সিনেমা ‘গান্ধী’। সিনেমায় গান্ধী চরিত্রে অভিনয় করে তুমুল প্রশংসা পান স্যার বেন কিংসলে। অস্কারও পেয়েছিলেন। সিনেমাটি মোট ৮টি বিভাগে অস্কার জিতেছিল। কিন্তু এই সিনেমায় আরেক কিংবদন্তি চরিত্র ছিল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। সেটি করেছিলেন ভারতের বিজ্ঞাপন অঙ্গন ও থিয়েটারের প্রবাদপুরুষ আলেক পদমসি। একটি সিনেমায়ই অভিনয় করেছিলেন পদমসি আর সেটির জন্যই অমর থাকবেন।

আলেক এই সিনেমা করতে গিয়ে নানা ধরনের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। সবই তিনি লিখেছেন আত্মজীবনী ‘এ ডাবল লাইফ’-এ। বইটি পেঙ্গুইন ইন্ডিয়া থেকে ২০০০ সালে প্রকাশ হয়। পদমসি লিখেছেন, চলচ্চিত্রে কোনো অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও অ্যাটেনবরো একটুও নিরুৎসাহিত হননি। সিনেমার প্রধান অভিনয়শিল্পীদের বেশিরভাগই ছিলেন মঞ্চনাটকের মানুষ। এদের মধ্যে ছিলেন বেন কিংসলে (মহাত্মা গান্ধী), রোহিনী হত্তনগড়ি (কস্তুরবা গান্ধী), রোশাস সেঠ (জওহরলাল নেহরু) ও সাইদ জাফরী (বল্লভভাই প্যাটেল)। অ্যাটেনবরো আলেককে বলেছিলেন, ‘চলচ্চিত্র অভিনেতারা ভালো কাজ করেন, কিন্তু মঞ্চের অভিনেতাদের ওপর আমার বিশ্বাস বেশি।’

এই কথা শুনে বেশ আশাবাদী হয়েছিলেন পদমসি। মনে করেছিলেন অভিনয় করে কিছু পয়সা পাওয়া যাবে। তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘এতে অন্তত কিছু টাকা পাওয়া যাবে তো?’ উত্তরে অ্যাটেনবরো বলেছিলেন, ‘খুব বেশি না। কারন এটা একটা আর্টফিল্ম।’

পদমসিকে কি অ্যাটেনবরো খুঁজে বের করেছিলেন? আসলে কিছু ক্ষেত্রে ভাগ্য সহায় হয়। মানুষকে নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে দেয়। অ্যাটেনবরোর সঙ্গে একবার, একটি পার্টিতে দেখা করেছিলেন আলেক পদমসি। সেখানেই পরিচালক তার উচ্চতা ও ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হন। পদমসিকে জিন্নাহর চরিত্রে নেয়ার কারণ ছিল। পদমসির ভাষ্য অনুযায়ী, অ্যাটেনবরো বলেছিলেন, ‘জিন্নাহ ছিলেন কর্তৃত্বপরায়ণ মানুষ। তোমার মধ্যেও সেই লক্ষণগুলো দেখতে পাচ্ছি। তুমি লম্বা ও রোগা। জিন্নাহও তেমনই ছিলেন। আর তোমার মধ্যে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার এক ধরনের গুণের উপস্থিতি আছে। তুমি ভ্রু তুললেই মানুষ নার্ভাস হয়ে যায়। জিন্নাহর ক্ষেত্রেও এমনটাই ছিল।’

পদমসি প্রথম যে দৃশ্যটির শুটিং করেন, তাতে দেখা যায় ১৯১৬ সালে জিন্নাহ একটি কংগ্রেস সম্মেলনে ভাষণ দিচ্ছেন। সেই সম্মেলনেই স্বরাজের দাবিতে কংগ্রেস ও জিন্নাহর মুসলিম লীগের মধ্যে সহযোগিতার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।

চরিত্রটির জন্য প্রস্তুতি নিতে পদমসি কথা বলেছিলেন তার বন্ধু রুস্তম গাগরাটের সঙ্গে। রুস্তম এক সময় জিন্নাহর সঙ্গে কাজ করেছিলেন। এছাড়া তিনি পরামর্শ নিয়েছিলেন বিশিষ্ট আইনজীবী এইচ এম সিরভাইয়ের কাছ থেকেও। আত্মজীবনীতে তিনি সীরভাইয়ের বর্ণিত জিন্নাহ বিষয়ক একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। মুম্বাইয়ে গভর্নর রজার লুমলির বাসভবনে এক নৈশভোজ ছিল। সেখানে গভর্নরের স্ত্রী জিন্নাহর পারসি স্ত্রী রত্তনবাইয়ের পোশাক নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেন। এতে ক্ষুব্ধ জিন্নাহ ভদ্রভাবে অনুষ্ঠান ত্যাগ করেন। পদমসি লিখেছেন, ‘জিন্নাহ এমন মানুষ ছিলেন, যাকে কেউ—এমনকি ব্রিটিশরাও—ভয় দেখিয়ে দমিয়ে রাখতে পারত না।’

চরিত্রের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে পদমসিকে লন্ডনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল জিন্নাহর বিখ্যাত পোশাকশৈলীর অনুকরণে স্যুট তৈরির জন্য। তিনি লিখেছেন, ‘পোশাকগুলো তৈরি করতে হয়েছিল জিন্নাহর পছন্দের বিখ্যাত স্যাভিল রো স্যুটের আদলে। সেগুলো তৈরি হয়েছিল আলপাকা কাপড়ে, যে কাপড়ে সহজে ভাঁজ পড়ে না।’

পদমসি প্রথম যে দৃশ্যটির শুটিং করেন, তাতে দেখা যায় ১৯১৬ সালে জিন্নাহ একটি কংগ্রেস সম্মেলনে ভাষণ দিচ্ছেন। সেই সম্মেলনেই স্বরাজের দাবিতে কংগ্রেস ও জিন্নাহর মুসলিম লীগের মধ্যে সহযোগিতার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।

আলেক পদমসি

শুটিং সেটে অ্যাটেনবরোর পেশাদারত্ব ও সহানুভূতির কথা স্মরণ করেছেন পদমসি। জিন্নাহর স্বশাসনের পক্ষে দেওয়া আবেগঘন ভাষণের দৃশ্যটি তিনি তিনবার ধারণ করেছিলেন। প্রথমবার অভিনয় ছিল অতিরিক্ত নাটকীয়, দ্বিতীয়বার অতিরিক্ত সংযত। তখন অ্যাটেনবরো তাকে পরামর্শ দেন, শরীরের অঙ্গভঙ্গির চেয়ে চোখের অভিব্যক্তির ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে। তিনি বলেছিলেন, ‘চলচ্চিত্র অভিনেতারা চোখ দিয়ে অভিনয় করেন।’

তৃতীয়বারেই পদমসি সঠিক ছন্দ খুঁজে পান।

গান্ধীর শুটিং চলাকালে পদমসি তার জীবনের সবচেয়ে সফল বিজ্ঞাপনটিও লিখেছিলেন বলে দাবি করেন। তিনি মোট সাতটি সপ্তাহান্তে (উইকএন্ড) শুটিং করেছিলেন। কারণ বাকি দিনগুলোতে তাকে নিজের পেশাগত কাজ করতে হতো। তবে বিজ্ঞাপনের বিষয়টিও সিনেমার সঙ্গেই যুক্ত।

পদমসি লিখেছেন, ‘১৯৮১ সালের ৩০ জানুয়ারি হিন্দুস্তান টাইমসে প্রকাশিত বিজ্ঞাপনটিতে শুধু লেখা ছিল, ‘‘৩১ জানুয়ারি ইতিহাস পুনর্নির্মিত হবে। আপনি কি সেখানে থাকবেন?’’

অ্যাটেনবরোর কাছে অনেক বড় বাজেট ছিল না। কিন্তু গান্ধীর শেষযাত্রার দৃশ্যটি বড় করে করতেই হতো। অ্যাটেনবরো আলেককে একটি বিজ্ঞাপন লেখার কাজ দেন—দিল্লির রাজপথে গান্ধীর শেষযাত্রার দৃশ্যের জন্য অতিরিক্ত শিল্পী আহ্বানের বিজ্ঞাপনের কপি লিখতে হবে। উদ্দেশ্য ছিল দিল্লিবাসীকে সেই শোভাযাত্রার অংশ হতে আমন্ত্রণ জানানো।

পদমসি লিখেছেন, ‘১৯৮১ সালের ৩০ জানুয়ারি হিন্দুস্তান টাইমসে প্রকাশিত বিজ্ঞাপনটিতে শুধু লেখা ছিল, ‘‘৩১ জানুয়ারি ইতিহাস পুনর্নির্মিত হবে। আপনি কি সেখানে থাকবেন?’’

সকালে শুটিং লোকেশনে পৌঁছে দেখি মাত্র পাঁচজন মানুষ এসেছে। তারপর এল আরও দশজন। এরপর পাঁচশ, তারপর পাঁচ হাজার। শেষ পর্যন্ত পুরো রাজপথ মানুষে ভরে যায়। অ্যাটেনবরো আটটি ক্যামেরা দিয়ে সারাদিন শুটিং করেছিলেন। উপস্থিত সবাইকে লাঞ্চের প্যাকেট দিয়েছিলেন অ্যাটেনবরো। কাউকে পারিশ্রমিক দেওয়া হয়নি। কিন্তু রাজপথে হাজার হাজার মানুষের সেই দৃশ্য চলচ্চিত্রটিকে অসাধারণ মাত্রা দিয়েছে।’

জিন্নাহ চরিত্রের জন্য ছয়টি স্যুট তৈরি করা হয়েছিল। শুটিং শেষ হওয়ার পর পদমসি অ্যাটেনবরোকে অনুরোধ করেছিলেন, ছয়টি স্যুট তিনি রাখতে চান। কিন্তু সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা হয়। কারণ পোশাকগুলো কস্টিউম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে ফেরত দিতে হয়েছিল। তবে অ্যাটেনবরো তাকে একটি স্মারক উপহার দিয়েছিলেন। জিন্নাহ চরিত্রের ব্যবহৃত মনোকলটি আলেককে দিয়েছিলেন। বাজেট সচেতন এই পরিচালক তখন স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন, মনোকলটির দাম ছিল ১০ পাউন্ড। পদমসি লিখেছেন, ‘এটি আমার পারিবারিক উত্তরাধিকারগুলোর একটি হয়ে থাকবে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে যাবে। এমনটাই আশা করি।’

 

সম্পর্কিত লেখা