‘তামাশা’ই ছিল ভিতাবাই নারায়ণগাঁওকরের প্রেম
লেখক: মাহমুদ (Mahmud) · ২৭ জুন, ২০২৬ · বিভাগ: ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি
মহারাষ্ট্রের নিজস্ব সংস্কৃতি তামাশা। মঞ্চে পারফর্ম করা হয় এটি। সহজে বলতে গেলে তামাশা অনেকটা যাত্রা, লোকগান, নৃত্যনাট্য সবকিছুর মিশ্র রূপ। অভিনয় আছে, গান আছে, নাচ আছে, কিছুটা খিস্তিও আছে। এই তামাশার অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব ভিতাবাই নারায়ণগাঁওকর। জীবনেও চেয়েও তামাশাকে ভালোবাসাতেন বেশি। সন্তান জন্মদানের কয়েক মিনিটের মাথায় মঞ্চে উঠে পারফর্ম করেছিলেন তিনি। তাকে নিয়ে লক্ষ্মণ উতেকর নির্মাণ করেছেন ঈথা। সিনেমায় অভিনয় করেছেন শ্রদ্ধা কাপুর
ভারতের সিনেমা। বলিউডের সিনেমা। ট্রেলার। তবে সূচনাটা খানিক ভিন্ন। একটি মঞ্চ, দর্শকের উচ্ছ্বসিত শিস আর এক শিল্পীর নাম ধরে চিৎকার। কিন্তু মঞ্চের পেছনে গ্রিনরুমে তিনি প্রসব করছেন সন্তান। একেবারেই একা। তীব্র যন্ত্রণার মধ্যেও শিল্পীর কান সজাগ। তিনি শুনছেন বাদ্য বাজছে। এদিকে দর্শক আর অপেক্ষা করতে রাজি না। শিল্পীও চান না তাদের অপেক্ষা করাতে। সন্তান প্রসবের মাত্র কয়েক মিনিট পরই, পেট শক্ত করে বেঁধে শাড়ি বেধে তিনি মঞ্চে উঠে দাঁড়ান। নাচবেন। তিনি নাচলেন। এ যেন সত্যিই এক তামাশা।
ইউটিউবে এই চরিত্রে দেখা যাবে শ্রদ্ধা কাপুরকে। বড় পর্দায় ‘ঈথা’ নামের সিনেমায় হাজির হবেন তিনি। তবে অভিনয় করেছেন এক বাস্তব চরিত্রের অনুপ্রেরণায়। তিনি মহারাষ্ট্রের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তামাশা শিল্পী ভিতাবাই নারায়ণগাঁওকর। আর যে শিশুটির কথা বলা হলো তার নাম কৈলাস নারায়ণগাঁওকর। ১৯৬২ সালের ৩ জুন মহারাষ্ট্রের সাতারা জেলার শিখর শিংনাপুর গ্রামে জন্ম তার। বয়স এখন ৬৪। মায়ের কিংবদন্তির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই গল্প তিনি আজও বহন করে চলেছেন।
১৯৩৫ সালের ১ জুলাই পন্ধারপুরে জন্মগ্রহণ করেন ভিতাবাই। তিনি ছিলেন দলিত মাঙ্গ সম্প্রদায়ের সন্তান। তার পুরো নাম ভিতাবাই ভাউ মাঙ্গ। এই মাঙ্গ সম্প্রদায়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল তামাশা। সেটা কী? সংগীত, নৃত্য, ব্যঙ্গ, কবিতা ও সামাজিক ভাষ্যকে একত্রিত করা এক অভিনয়শিল্প। মহারাষ্ট্রের গ্রামীণ অঞ্চলের ভ্রাম্যমাণ মঞ্চে অভিনয় করত তামাশা শিল্পীরা। এর ধাঁচ অনেকটা আমাদের যাত্রা ও কবিগানের যুগলবন্দীর মতো। অভিনয় থাকে, মহারাষ্ট্রের লোকগান ও নাচ ‘লাভানী’ থাকে, কৌতুক, খিস্তিও থাকে। ফলে অভিনয়ের পাশাপাশি উপস্থিত বুদ্ধি ও রসবোধও কাজে লাগে।
মা কখনও আদর-আহ্লাদে ভরা মানুষ ছিলেন না। নিঃশর্ত ভালোবাসা বলতে তিনি শুধু তার শিল্পকেই বুঝতেন। অন্য কিছু তার ধারেকাছেও আসতে পারেনি।
ভিতাবাইয়ের ছিল শক্তিশালী কণ্ঠ, তীক্ষ্ণ রসবোধ। মঞ্চে বিদ্যুতের জ্যোতির মতো উপস্থিত হতেন। তামাশা করতে করতে তিনি এক সময় মহারাষ্ট্রে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। নিজের নামে তামাশার দলও করেছিলেন। পরবর্তীতে লোকসংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি দুবার ভারতে রাষ্ট্রপতির পদক লাভ করেন। একবার ১৯৫৭ এবং পরেরবার ১৯৯০ সালে।
প্রায় প্রান্তিক পর্যায়ে থেকে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পাওয়া সম্ভব হয়েছিল শিল্পের প্রতি নিবেদন ও ভালোবাসার কারণে। ভিতা কেবল শিল্পকেই ভালোবাসতেন। কৈলাস নারায়ণগাঁওকর বলেন, ‘মা কখনও আদর-আহ্লাদে ভরা মানুষ ছিলেন না। নিঃশর্ত ভালোবাসা বলতে তিনি শুধু তার শিল্পকেই বুঝতেন। অন্য কিছু তার ধারেকাছেও আসতে পারেনি।’
ভিতাবাইয়ের সন্তান মোট আটজন। তাদের অনেকেই পরবর্তীতে মঞ্চে পা রেখেছিলেন। কিংবদন্তিতুল্য হয়েছেন মঙ্গলা বানসোদে, মালতী ইনামদার, ভারতী সোনাওয়ানে এবং প্রয়াত সন্ধ্যা মানে। বর্তমানে কৈলাস নারায়ণগাঁওকর এবং তাঁর দুই ছেলে রোহিত ও মোহিত নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ‘ভিতাবাই ভাউ মাঙ্গ নারায়ণগাঁওকর’ দলটি পরিচালনা করছেন।

নিজের সময়ে সাফল্যের শিখরে ছিলেন ভিতাবাই। ‘তামাশা সম্রাজ্ঞী’ নামে পরিচিত ভিতাবাই। দর্শকেরা তাকে যেমন তার শিল্পের জন্য ভালোবাসতেন, তেমনই তার তীক্ষ্ণ রসবোধ ও প্রতিউত্তরের জন্যও তিনি ছিলেন কিংবদন্তি।
এ বিষয়টি সম্মরণ করে মঙ্গলা বানসোদে বলেন, ‘মানুষ তার মঞ্চ-উপস্থিতিকে আজও মনে রেখেছে। কারণ যে শক্তি আর কর্তৃত্বর প্রকাশ তার মধ্যে ছিল তা শেখানো যায় না। কিন্তু তার ধারালো জিভের (কথা) সঙ্গে কিছুই তুলনীয় ছিল না।’
অভিনেতা নিলু ফুলে একবার ভিতাবাইকে নিয়ে একটি ঘটনার কথা বলেছিলেন। এক অনুষ্ঠানে মঞ্চ ছাড়ার আগে এক অভিনেতাকে তিনি বলেছিলেন, ‘ওপারে গিয়ে একটা পাঠান পাঠিয়ে দিও’, যাতে পরবর্তী পর্বের প্রস্তুতি নেওয়া যায়। তখন দর্শকদের মধ্য থেকে কেউ অশালীন মন্তব্য করে বলে ওঠে, ‘মনে হয় বাইয়ের একটা পাঠান দরকার।’ মুহূর্তের মধ্যে ভিতাবাই সেই ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে জবাব দেন, ‘একটা নয়, দুটো পাঠাও—একটা আমার জন্য, আরেকটা ওর মায়ের জন্য।’
এই প্রভাবের ভিত্তি কেবল জনপ্রিয়তা নয়, শিল্পের প্রতি গভীর বিশ্বাসও। দাম্পত্য জীবনে নির্যাতন ও চরম আর্থিক কষ্টের মধ্য দিয়েও তিনি তামাশা এবং তার ঘনিষ্ঠ শিল্পরূপকে চলচ্চিত্রের চাহিদা অনুযায়ী বদলে ফেলার বিরোধিতা করেছিলেন
ভিতাবাইয়ের কর্তৃত্ব প্রভাব ফেলেছিল সর্বব্যাপী। তাকে সবাই শ্রদ্ধাও করতেন। ১৯৮১ সালের আরেকটি ঘটনার কথা স্মরণ করেন মোহিত নারায়ণগাঁওকর। জ্বালানি সংকটের কারণে ভ্রাম্যমাণ তামাশা দলগুলোর পক্ষে সফর চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। শিল্পীদের একটি প্রতিনিধি দল তখন মুখ্যমন্ত্রী এ. আর. অন্তুলের সঙ্গে দেখা করতে যায়, যার নেতৃত্বে ছিলেন ভিতাবাই।
মোহিত বলেন, ‘দলের মধ্যে ভিতাবাইকে দেখে মুখ্যমন্ত্রী সঙ্গে সঙ্গেই নিবন্ধিত তামাশা দলগুলোর জন্য ভর্তুকিযুক্ত ডিজেল অনুমোদন করেন। নিজের জন্য তিনি কখনও প্রভাব খাটাতেন না। কিন্তু এই ঘটনা তার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধার প্রমাণ।’
এই প্রভাবের ভিত্তি কেবল জনপ্রিয়তা নয়, শিল্পের প্রতি গভীর বিশ্বাসও। দাম্পত্য জীবনে নির্যাতন ও চরম আর্থিক কষ্টের মধ্য দিয়েও তিনি তামাশা এবং তার ঘনিষ্ঠ শিল্পরূপকে চলচ্চিত্রের চাহিদা অনুযায়ী বদলে ফেলার বিরোধিতা করেছিলেন।
পরিবর্তিত সময়ে তামাশা খুব একটা চলছিল না। মানুষ সিনেমার দিকে ঝুঁকেছিল। সে কারণে অনেক তামাশা দল সিনেমার গান এবং সংক্ষিপ্ত পরিবেশনার দিকে ঝুঁকেছিল। বহু মারাঠি চলচ্চিত্রেও তামাশার জগৎ উঠে এসেছে। কিন্তু ভিতাবাই ঐতিহ্যগত রূপ বজায় রাখার পক্ষে ছিলেন। তিনি তামাশার মধ্যে সিনেমাকে ঢোকানোর পক্ষে ছিলেন না।
মঙ্গলা বানসোদে বলেন, ‘তিনি লাভানীর (মহারাষ্ট্রের বিশেষ নৃত্য; লোকসংগীতের সঙ্গে নাচ হতো) চলচ্চিত্রীয় রূপান্তরের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি চাইতেন দর্শক যেন তামাশাকে তার পূর্ণাঙ্গ রূপে—গান, গৌলান, ভাগ এবং বল-বাতাওনিসহ উপভোগ করতে পারে।’
তামাশার বিষয়টি বেশকিছু হিন্দি ও মারাঠি সিনেমায় এসেছে। এর মধ্যে ইমতিয়াজ আলী তার ‘তামাশা’য় বলতে চেয়েছিলেন মানুষের পুরো জীবনটাই আসলে ‘তামাশা’। তবে ভিতাবাইয়ের জীবন সিনেমায় আসেনি। ঈথার আগে ভিতাবাইয়ের জীবন অবলম্বনে শান্তনু ঘুলের মারাঠি নাটক বিঠা এবং একই নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল। পুন্ডলিক ধুমল পরিচালিত এবং উর্মিলা কানেটকর অভিনীত সিনেমাটি এক দশকেরও বেশি আগে সম্পন্ন হলেও কখনও মুক্তি পায়নি।

বিষয়টি নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যম স্ক্রলকে ধুমল বলেন, ‘পরিবারের সঙ্গে কথা বলেই আমি সিনেমাটি তৈরি করেছিলাম। কিন্তু ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে মুক্তি দিতে পারিনি। লক্ষ্মণের সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে দেখে আমি খুশি। মহারাষ্ট্রের লোকশিল্পে ভিতাবাইয়ের অবদান আরও অনেক বেশি স্বীকৃতি পাওয়ার দাবি রাখে।’
আধুনিক সময়ে লোকগান, লোকগল্পর পাশাপাশি অনেক পুরনো সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে। ঈথা সেখানে নতুন একটি বার্তা। ভিতাবাইয়ের মঞ্চের কর্তৃত্ব এমন এক জগতের মধ্যে বিকশিত হয়েছিল, যা মহারাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক কল্পনায় দীর্ঘদিন ধরেই এক দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থানে রয়েছে। তামাশা টিকে থাকবে কিনা তা নিয়েও চলছে নানা রকম দ্বিধা।
গবেষক শৈলজা পাইক তার দ্য ভালগারিটি অব কাস্ট: দলিতস, সেক্সুয়ালিটি অ্যান্ড হিউম্যানিটি ইন ইন্ডিয়ায় লিখেছেন, ‘তামাশা যেমন তামাশা শিল্পীদের জীবিকা দিয়েছে এবং নারীদের কিছুটা স্বাধীনতা এনে দিয়েছে, তেমনই তাদের অশ্লীল তকমাও দিয়েছে। মুক্তি ও অধীনতার এই দ্বৈততাই ছিল তাদের বাস্তবতা।’
তামাশা শিল্পীরা নানাভাবে বঞ্চিত ছিলেন। ভিতাবাইর এক সাক্ষাৎকারের উল্লেখ করেছেন শৈলজা পাইক। ১৯৮০ সালে নাসিকের একটি তামাশা উৎসবের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে ভিতাবাই বলেছিলেন, ‘অনুষ্ঠানের স্থানে পানির মতো মৌলিক ব্যবস্থাও ছিল না। যেখানে সবাই প্রস্রাব-পায়খানা করত, সেখানেই আমরা রান্না করতাম, খেতাম এবং শিশুদের নিয়ে শীতের রাতে ঘুমাতাম।’
লেখক ও ভাষ্যকার মুকুন্দ কুলের মতে, তামাশা ও লাভনীর জন্ম মহারাষ্ট্রের সবচেয়ে নিপীড়িত সম্প্রদায়গুলোর অভিজ্ঞতা থেকে। তার ভাষায়, ‘অনেক দলিত সম্প্রদায়ের জন্য গান গাওয়া, নাচা বা বিনোদন দেওয়ার বিষয়টি তাদের ইচ্ছাধীন ছিল না। গভীর বৈষম্যমূলক সামাজিক ব্যবস্থার মধ্যেই তাদের ওপর এই বিষয়গুলো চাপিয়ে দেওয়া হতো।’
কুলে মনে করেন, তামাশার ইতিহাসকে জাতপাতের প্রশ্ন থেকে আলাদা করা অসম্ভব। তিনি বলেন, ‘যারা এই শিল্প সৃষ্টি ও লালন করেছে, তারা খুব কমই সামাজিক সীমানা অতিক্রম করতে পেরেছে। লাভানী পরিবেশনকারী নারীদের অবস্থান ছিল আরও জটিল। তাদের শরীর নিয়ন্ত্রিত, পণ্যায়িত এবং বিচারিত হয়েছে। শহুরে অভিজাতরা পরবর্তীতে এর সংবেদনশীলতাকে অশ্লীলতা হিসেবে দেখেছে। অথচ তামাশা বরাবরই ছিল বহুস্তরীয়। এটি সামাজিক রীতিনীতি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, ফ্লুইড আইডেন্টিটিকে জায়গা দিয়েছে এবং প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে।’
ঈথা হয়তো তামাশার প্রতি নতুন করে মনোযোগ আকর্ষণ করবে, তবে বলিউডের প্রভাবে এই জটিল ঐতিহ্যের সরলীকরণ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
মুকুন্দ কুলে বলেন, ‘ঈথা বলিউডের ক্রমবর্ধমান মারাঠি ইতিহাস, সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও আইকন-নির্ভর আগ্রহের সর্বশেষ উদাহরণ মাত্র।’ ছাভা-র বাণিজ্যিক সাফল্যের পর, মারাঠি বিষয়বস্তুকে হিন্দিকরণের প্রবণতা যে বাড়ছে, তাও তিনি উল্লেখ করেন। এখন নানাভাবে মারাঠা, মারাঠি ইতিহাস, ব্যক্তিত্ব ও সংস্কৃতিকে সামনে আনার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। মারাঠদের ইতিহাসকে করা হচ্ছে মহিমান্বিত। লক্ষণ উতেকর যে ভিতাবাইয়ের মুখে উগ্র জাতীয়তাবাদী কোনো সংলাপ বসাবেন না তা গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায় না।

ভিতাবাইর পরিবার ঈথা ঘিরে আশাবাদী হলেও সতর্ক। মোহিত নারায়ণগাঁওকর জানান, ম্যাডক ফিল্মস এবং কাঠপুতলি ক্রিয়েশনসকে ভিতাবাইয়ের কিছু ছবি দেওয়া ছাড়া তাদের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি।
সিনেমার নির্মাতা লক্ষ্মণ উতেকর বা ম্যাডক ফিল্মস এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। স্ক্রলকে মোহিত বলেন, ‘সিনেমায় সৃজনশীল স্বাধীনতা নেওয়া হবেই। কিন্তু আমরা আশা করি, দিদিমাকে যেন তার প্রকৃত রূপেই দেখানো হয়। তিনি যেমন অসাধারণ ছিলেন, তেমনই ছিলেন নিঃসংকোচে মানবিক।’
২০০২ সালের ১৫ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন ভিতাবাই। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি তামাশা শিল্পের প্রতিই নিজেকে নিবেদিত রেখেছিলেন এমন নিষ্ঠা, যা আজও তার সন্তানদের বিস্মিত ও গর্বিত করে। তাই তাদেরও ইচ্ছা পরিবারের এই প্রায়-পৌরাণিক ব্যক্তিটিকে যেন ভুলভাবে উপস্থাপন করা না হয়।
ভিতাবাই লাভানী ও তামাশা নিয়েই ছিলেন। এদিকে বাস্তবে, সিনেমা লাভানীকে ধীরে ধীরে তার উৎসভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। নৃত্যরূপটি টিকে থাকলেও, যে পরিসরে এটি বেড়ে উঠেছিল, তা সংকুচিত হয়েছে। টেলিভিশন, অভিবাসন এবং গ্রামীণ মঞ্চের সংকোচনের ফলে তামাশাও ক্ষয়িষ্ণু। সফরের খরচ বেড়েছে, দর্শক কমেছে, আর নতুন প্রজন্মের অনেকেই নিরাপদ জীবিকার সন্ধানে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। আজ অনেক তরুণ মহারাষ্ট্রীয় লাভানীর সুর চিনতে পারলেও কখনও সরাসরি তামাশা দেখেননি। তবুও এই শিল্পরূপ হারিয়ে যায়নি।

শহরের নৃত্যবিদ্যালয়গুলোতে এখনও লাভনী শেখানো হয়। তরুণ শিল্পীরা নারীবাদী ও পরীক্ষামূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে এই শিল্পকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করছেন। সাংস্কৃতিক উৎসবগুলোতে এখনও লাভনীর স্থান রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম লাভনীকে সেই ধুলোমাখা মেলার মাঠের বাইরেও ছড়িয়ে দিয়েছে, যেখানে একসময় এর বিকাশ ঘটেছিল।
তবুও প্রশ্ন থেকে যায়—আজকের দিনে তামাশা কার জন্য? প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এটিকে বহন করে আনা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত শিল্পীদের জন্য? শহুরে কোরিওগ্রাফারদের জন্য? টেলিভিশন প্রযোজকদের জন্য? চলচ্চিত্রশিল্পের জন্য? নাকি রাষ্ট্রের জন্য?
সিনেমা হলের বাইরে, টিউবলাইটে আলোকিত ছোট ছোট মঞ্চে, পুরোনো জেনারেটরের শব্দের মধ্যে এখনও তামাশা পরিবেশিত হয় ক্ষীণ হয়ে আসা দর্শকদের সামনে। ঢোলকির শব্দ এখনও বাজে। গান এখনও রাতের আকাশে ভেসে ওঠে। আর দর্শক যত কমই হোক না কেন, এখনও অপেক্ষা করে।
ট্যাগ: #ইতিহাস