মাহমুদের মহাফেজখানা (Mahmud Writes) · সকল লেখা · বই

স্বাতী তিরুনালের সংগীত: বিতর্ক ও বাস্তবতা

লেখক: · ১ নভেম্বর, ২০২৬ · বিভাগ: ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি

swathi thirunal

সংগীতের প্রতি স্বাতী তিরুনালের আগ্রহ তৈরি হয়েছিল শৈশব থেকেই। তার জীবনে অন্যতম অনুপ্রেরণা ছিলেন তার চাচা, কবি ও সুরকার ইরায়িম্মান থাম্পি। তবে ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দে চারজন শিল্পীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। মুথুস্বামী দীক্ষিতরের শিষ্য এই চার ভাই—চিন্নাইয়া, পন্নাইয়া, শিবানন্দম এবং বাদিভেলু একত্রে ‘তাঞ্জাভুর কোয়ার্টেট’ নামে পরিচিত

কেরালা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিরুবনন্তপুরমের কারিয়াভাট্টম ক্যাম্পাস। সেখানে অবস্থিত ওরিয়েন্টাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও ম্যানাস্ক্রিপ্টস লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে বহু প্রাচীন দলিল ও পাণ্ডুলিপি। সেসব সংরক্ষণ করা হয়েছে লেমনগ্রাস অয়েল ও আইসোপ্রপানলের প্রলেপ দিয়ে। প্রাচীন এই সম্পদগুলো ছাদ পর্যন্ত স্তূপ করে রাখা আছে। বিপুল ভাণ্ডারের মধ্যেও একটি অংশ আলাদা করে নজর কাড়ে। একটি নিচু, কাঁচঘেরা আলমারিতে চোখে পড়বে। সামনে রাখা একটি পিতলের প্রদীপ।

আলমারির ভেতরে রয়েছে প্রায় ১২টি তালপাতার পাণ্ডুলিপি এবং ২৩টি পুরনো নোটবই। প্রতিটিই সবুজ ভেলভেটে বাঁধাই করা (যদিও কালের পরিক্রমায় বিবর্ণ)। শিরোনামগুলো রূপালি সুতো দিয়ে করা। এই নোটবইগুলোর কাগজে লন্ডনের স্টেশনারি প্রস্তুতকারকদের জলছাপ রয়েছে। তারিখ ১৮৩৭ থেকে ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। কিন্তু কী আছে পাণ্ডুলিপি ও নোটবুকে? খুবই সুন্দর, বাঁকানো পুরনো মালয়ালম ও দেবনাগরীতে লেখা আছে সংগীত রচনা, প্রবন্ধ এবং পদ্মনাভ মন্দিরের ইতিহাস। এই সংগ্রহে রয়েছে কর্ণাটক সঙ্গীতের বর্ণম, পদম, কীর্তনম, স্বরাজতি এবং উৎসবের গান, পাশাপাশি কবিরের দোহা মালয়ালম লিপিতে। আরো আছে ‘হিন্দুস্তানি সাহিত্যাম’ নামে একটি খণ্ড।

এই হলদেটে দলিলগুলোর মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ ভারতের সংগীতের ইতিহাস। দলিলগুলো স্বাতী তিরুনালের (১৬ এপ্রিল, ১৮১৩—২৫ ডিসেম্বর, ১৮৪৬ খ্রি.) লেখকস্বত্বা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। স্বাতী ছিলেন যা উনবিংশ শতকের ত্রিবাঙ্কুরের রাজা। তার জীবন ছিল মাত্র ৩৪ বছরের। প্রতিভাবান এই মানুষটি ছিলেন বহুভাষাবিদ, সংগীতকার ও সুরকার। ধারণা করা হয় তিনি অন্তত ৩০০টি রচনা রেখে গেছেন। এর মধ্যে বেশিরভাগ কর্ণাটকী হলেও হিন্দুস্থানি ধারাতেও লিখেছেন। এছাড়া তার প্রচেষ্টায় কেরালায় কর্ণাটক সঙ্গীতের একটি বিকল্প কেন্দ্র গড়ে ওঠে, যা স্থানীয় সোপানম সঙ্গীত পদ্ধতিকে ছাপিয়ে যায়।

সংরক্ষিত এই দলিলগুলো নিয়ে গত শতকের সত্তরের দশকে বিতর্ক উঠেছিল। প্রশ্ন উঠেছিল—এই রচনাগুলো কি সত্যিই রাজার সৃষ্টি? তিনি কি শুধু গানের কথা লিখতেন এবং সুর দিতেন তার দরবারের কিংবদন্তি সঙ্গীতজ্ঞরা? ২০শ শতকের শুরুর দিকে কি রাজভক্তরা তাকে প্রতিভা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে প্রভাব খাটিয়েছিলেন? তাকে কি কর্ণাটক সঙ্গীতের ত্রয়ীর সমপর্যায়ে রাখা যায়? আরো একটি প্রশ্ন উঠেছিল—স্বাতী তিরুনাল বলে কি আদৌ কেউ ছিলেন?

ত্রিবাঙ্কুরের রাজা স্বাতী তিরুনাল। ছবি: কোম্পানি স্কুল ওয়াটারকালারস

ঐতিহাসিক বিষয় নিয়ে নানা সময়েই বিতর্ক উঠে থাকে। তবে কখনো কখনো সেসবের প্রতিক্রিয়ায় দেখা যায় ক্ষোভ, বিষোদ্গার। স্বাতীর ক্ষেত্রেও এরকমই হয়েছিল। বিষয়টিকে এক রকম আঞ্চলিক পক্ষপাত হিসেবেও দেখা হয়েছে। পরবর্তীতে একজন কম্পিউটার বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ এবং সংগীতজ্ঞ এর জবাব দেন। ফাঁকা বুলি না, তিনি গবেষণা ও বিজ্ঞানের মাধ্যমেই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়েছিলেন। এই ব্যক্তির নাম এ. অচ্যুতসঙ্কর নায়ার।

৪০ বছর ধরে নানা পাণ্ডুলিপি, ঐতিহাসিক দলিলসহ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা নানা তথ্য বিশ্লেষণ করছেন অচ্যুত। সাম্প্রতিককালে স্টাইলোমেট্রি ব্যবহার করে স্বাতী তিরুনালের বিতর্কিত রচনাবলীর সত্যতা প্রতিষ্ঠারও চেষ্টা করেছেন। এই গবেষণার শুরুতেই তিনি স্বাতীর অস্বিত্বকে প্রমাণ করেন। নায়ার জানান, রাজা হিসেবে স্বাতী তিরুনালেল জীবনের প্রায় প্রতিটি ঘটনাই নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ, প্রতিষ্ঠান এবং ভ্রমণকারীদের বিবরণও রয়েছে।

অচ্যুত নায়ারের গবেষণায় একটি পিএইচডি থিসিস ও একটি বইও প্রকাশ হয়েছে। বইয়ের নাম ‘স্বাতী তিরুনাল: এ কম্পোজার বর্ন টু এ মাদার’। এছাড়াও, প্রায় দুই দশক ধরে নিষ্ক্রিয় থাকা একটি সরকারি ওয়েবসাইট পুনরায় চালু করা হয়েছে। এটি স্বাতীকে উৎসর্গ করা। সাইটে তার রচনাবলীর লেখকত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য এই গবেষণা ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি ভারতের কোনো সুরকারের কাজের ডিজিটাল ভাণ্ডার তৈরির একমাত্র সরকারি উদ্যোগ। প্রকল্পটি ভাইলোপ্পিল্লি সংস্কৃতি ভবন এবং সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অব ইমেজিং টেকনোলজির সহযোগিতায় পরিচালিত।

কেরালা এবং বৃহত্তর কর্ণাটক সঙ্গীত জগতে স্বাতী তিরুনালের জীবনের নাটকীয়তা এবং সঙ্গীত দীর্ঘদিন ধরে আকর্ষণের বিষয়। শৈশবেই রাজা হয়েছিলেন স্বাতী। তিনি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির মধ্যেও সঙ্গীত ও নৃত্যে অনুরাগী ছিলেন। নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন নিজের মতো করে। আর শিল্পে আর ভালোবাসা ছিল জীবনের শেষ দিন পর্যণ্ত। স্বাতী তিরুনালের জীবন নিয়ে বহু বই, গবেষণা, প্রবন্ধ, চলচ্চিত্র এবং তথ্যচিত্র তৈরি হয়েছে।

কিন্তু তার লেগ্যাসি ধরে রাখা নথিগুলো এতোটাই তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল যে ১৯৯০-এর দশকে তা প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির দপ্তর এবং শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালত পর্যন্ত পৌঁছায়।

স্বাতী তিরুনাল প্যালেস

স্বাতী তিরুনালকে বুঝতে হলে তার সময়টাকে দেখতে হবে। ১৮১৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন স্বাতী তিরুনাল। ত্রিবাঙ্কুরের সিংহাসনের উত্তরাধিকারি ছিলেন তিনি। কিন্তু সময়টা ছিল বিরুদ্ধ। ততদিনে দক্ষিণ ভারতেও ব্রিটিশরা থাবা বিস্তার করেছে। তবে এতে ত্রিবাঙ্কুরের সিংহাসন ও রাজপরিবারের ক্ষতি হলেও সেই সময়ের ইতিহাসের অনেক কথা ব্রিটিশদের সূত্রেই পাওয়া যায়।

কর্নেল জেমস ওয়েলশ তার ‘মিলিটারি রেমিনিসেন্সেস’ বইয়ে লিখেছেন, ‘তেরো বছরের এই ছেলেটি মানসিকভাবে অনেক উন্নত মনে হলো। যদিও শারীরিকভাবে সে ছোটখাটো। ছেলেটি ম্যালকমের ‘সেন্ট্রাল ইন্ডিয়া’ থেকে একটি অধ্যায়, গভর্নর জেনারেলের পারস্য ভাষার চিঠি, সংস্কৃত ও মালয়ালমের অংশ পড়ে শোনাল এবং সব ক্ষেত্রেই সমান দক্ষতা দেখাল। এরপর সে ইউক্লিডের ৪৭তম উপপাদ্য এঁকে দেখাল।’

কেবল সংগীত না। নৃত্য ও সাহিত্যেও আগ্রহী ছিলেন স্বাতী। রাম বর্মা বলেন, ‘তিনি ছিলেন এক পূর্ণাঙ্গ শিল্পী। সাহিত্য থেকে নৃত্য, সবকিছুতেই আগ্রহ ছিল তার।’

এই ঘটনার তিন বছর পরই সিংহাসনে আরোহণ করেন স্বাতী তিরুনাল। অর্থাৎ সিংহাসন লাভ করেন ১৬ বছর বয়সে। স্বাতীর দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা ছিল। তারপরও অসুস্থতা নিয়েই ব্রিটিশদের প্রভাবের বিরুদ্ধে লড়ে গেছেন। এর ফলে বহন করেছেন ব্যক্তিগত অনেক ক্ষতিও।

গায়ক ও বীণা শিল্পী রামা বর্মার মতে, ‘তার জীবন ছিল গভীরভাবে বেদনাদায়ক। সন্তান, দুই স্ত্রী এবং প্রিয় এক নৃত্যশিল্পীর মৃত্যু তাকে আঘাত করেছিল। তিনি বুঝেছিলেন যে প্রশাসনিক লড়াইয়ে ব্রিটিশদের কাছে হার মানতে হবে। কিন্তু তবুও তার কবিতায় কখনও করুণা ভিক্ষার সুর ছিল না।’

সংগীতের প্রতি স্বাতী তিরুনালের আগ্রহ তৈরি হয়েছিল শৈশব থেকেই। তার জীবনে অন্যতম অনুপ্রেরণা ছিলেন তার চাচা, কবি ও সুরকার ইরায়িম্মান থাম্পি। তবে ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দে চারজন শিল্পীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। মুথুস্বামী দীক্ষিতরের শিষ্য এই চার ভাই—চিন্নাইয়া, পন্নাইয়া, শিবানন্দম এবং বাদিভেলু একত্রে ‘তাঞ্জাভুর কোয়ার্টেট’ নামে পরিচিত—সঙ্গীত ও নৃত্যে অসাধারণ দক্ষ ছিলেন।  এদের সঙ্গে পরিচয়ই স্বাতী তিরুনালের সংগীত জীবনের গতি বদলে দেয়।

তাদের মধ্যে বাদিভেলু সবচেয়ে বেশি সময় ত্রিবাঙ্কুর দরবারে ছিলেন এবং রাজার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন। স্বাতী তিরুনালের এই সময়কার রচনায় সব ধরনের সংগীতরীতি অন্তর্ভুক্ত হয়। এর মধ্যে ছিল কৃতি, বর্ণম, তিল্লানা, জাভালি, স্বরাজতি ও পদম।

কেবল সংগীত না। নৃত্য ও সাহিত্যেও আগ্রহী ছিলেন স্বাতী। রাম বর্মা বলেন, ‘তিনি ছিলেন এক পূর্ণাঙ্গ শিল্পী। সাহিত্য থেকে নৃত্য, সবকিছুতেই আগ্রহ ছিল তার।’

এখানেই শেষ নয়। সংগীত, সাহিত্য, নৃত্য সব বিষয়ে আরো জানার ভারতভর যোগাযোগ করতেন। অচ্যুত নায়ারের মতে, ‘তিনি তার সময়ের এক অসাধারণ সুরকার। বিভিন্ন প্রভাব ও ধারাকে গ্রহণ করেছিলেন এবং ২৫০ বছর আগেই বৃহত্তর শ্রোতাদের সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্ব বুঝেছিলেন। এজন্য তিনি দাক্ষিণাত্য থেকে বারাণসী, অযোধ্যা, পাঞ্জাব, বাংলা, মহারাষ্ট্র এমনকি লাহোর পর্যন্ত সঙ্গীতজ্ঞ ও পণ্ডিতদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন।’

এত কিছুর পরেও, স্বাতী তিরুনালের সংগীত প্রকৃত অর্থে জনপ্রিয়তা পায় প্রায় ১০০ বছর আগে। ১৯২০-এর দশকের শেষের দিকে চেন্নাইয়ে বিভিন্ন সংগীত সভার উত্থান হয়। পাশাপাশি রেডিও ও গ্রামোফোনের মতো নতুন মাধ্যমের বিকাশ ঘটে। তবে সেই খ্যাতির সঙ্গেই তৈরি হয় বিতর্ক।

গত শতকের ত্রিশের দশকে (১৯৩০ খ্রি.) দশকে কর্ণাটক সংগীতে স্বাতী তিরুনালের নাম বারবার উচ্চারিত হতে শুরু করে। চেন্নাইয়ে তার খ্যাতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অবস্থা এমন হয় যে কর্ণাটক সংগীতের ত্রয়ীর সঙ্গে তার নাম উচ্চারিত হতে শুরু করে। এই ত্রয়ী ছিলেন—ত্যাগরাজ, মুথুস্বামী দীক্ষিত ও শ্যামা শাস্ত্রী। মিউজিক একাডেমি এক সময় এই ত্রয়ীর পাশে স্বাতীর প্রতিকৃতি স্থাপন করে। তার সংগীতকে ঘিরে থিমেটিক কনসার্ট ও আলোচনা শুরু হয় এবং তার জীবন ও শিল্প নিয়ে একাধিক বই প্রকাশিত হয়।

বিক্রম সম্পৎ লিখেছেন, ‘অন্তত আট বছর ধরে তার এই বিষয়টিই তার একমাত্র লক্ষ্য হয়ে ছিল। তিনি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি লিখেছেন, সংবাদমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন।’

স্বাতী তিরুনাল সম্পর্কে সাধারণ তো দূর, সংগীত নিয়ে আগ্রহীরাও তেমন একটা জানতেন না। এ নিয়ে তামিল লেখক ও সাংবাদিক কল্কি কৃষ্ণমূর্তির একটি মন্তব্য প্রাসঙ্গিক। ১৯৪০ সালে তিনি বলেছিলেন, ‘তিন বছর আগেও মানুষ স্বাতী তিরুনালের নাম শোনেনি। এখন তার গান সর্বত্র জনপ্রিয়… এটা কীভাবে ঘটল?’

স্বাতীর এই জনপ্রিয়তার ফলে নানা রকম অভিযোগ ওঠে। বলা হতে থাকে রাজপরিবার একটি পরিকল্পিত প্রচারণা চালিয়ে তাকে প্রতিভাবান সুরকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। এক্ষেত্রে তাদের সহযোগিতা করেছে প্রভাবশালী সঙ্গীতজ্ঞ সেম্মাঙ্গুডি শ্রীনিবাস আইয়ার এবং মুথাইয়া ভাগবতার। তারা তিরুবনন্তপুরমের স্বাতী তিরুনাল সংগীত কলেজের প্রধান ছিলেন।

এমন অনেক সময়ই হয়েছে যেখানে ক্ষমতাবানরা প্রতিভাবানদের সৃষ্টিকর্ম চুরি করে নিজের নামে চালিয়ে দেন। স্বাতীর ক্ষেত্রেও এরকমই একটি অভিযোগ ওঠে। অভিযোগটি প্রথম নথিভুক্ত হয় ১৯৮২ সালে। প্রখ্যাত বীণা শিল্পী কে.পি. শিবানন্দম দাবি করেন যে তার পূর্বপুরুষ ‘তাঞ্জাভুর কোয়ার্টেট’-এর বাদিভেলুই আসলে রাজার নামে প্রচলিত সৃষ্টিগুলোর প্রকৃত স্রষ্টা। তিনি দাবী করেন তার কাছে তালপাতার পাণ্ডুলিপি রয়েছে যা এই অভিযোগ প্রমাণ করতে পারবে। এর ফলে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে। তবে কিছুদিন পর বিতর্ক স্তিমিত হয়ে যায়। কিন্তু এক বছর পর এটি আবার জোরালোভাবে ফিরে আসে বীণা বাদক এস. বালাচন্দরের মাধ্যমে।

বালাচন্দরের জীবনী Voice of the Veena (২০১২), লেখক বিক্রম সম্পৎ। সেখানেই এই বিতর্কের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। সেম্মাঙ্গুডি শ্রীনিবাস আইয়ারের লেখা Maharaja Sri Swathi Thirunal জীবনীটি নিয়ে বালাচন্দর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি এটিকে ‘অতিরঞ্জন, মিথ্যা, কল্পনা এবং ভ্রান্তিতে পূর্ণ’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেন যে করদাতাদের অর্থে পরিচালিত ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট যেন বইটি প্রত্যাহার করে এবং মিউজিক অ্যাকাডেমিতে কর্ণাটক সংগীতের কিংবদন্তি ত্রয়ীর পাশে রাখা রাজার প্রতিকৃতি সরিয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ সুরকারদের গ্যালারিতে স্থানান্তর করা হয়।

বালাচন্দর বরাবরই সোজাসুজি কথা বলার জন্য বিথ্যাত। পাশাপাশি বইটি বিক্রম সম্পৎ রচিত বলে আলাপ আরো বড় পরিসরে হয়েছিল। বইয়ে বালাচন্দরের বক্তব্য অনুসারে তার দাবী, সংগীতজ্ঞ হিসেবে স্বাতী তিরুনালের ভাবমূর্তি নিছক প্রচারণার ফল। পুরো বিষয়টি প্রতারণা, মিথ, পরিকল্পিত ছলনা। তার বক্তব্যের পর স্বাতী বিষয়ক বিতর্ক সংবাদমাধ্যম ও সংগীতমহলে ব্যাপক আলোড়ন তোলে।

বায়োপিকের পোস্টার

বালাচন্দর বরাবরই বিষয়টি নিয়ে সরব ছিলেন। সম্পতের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৮৫ সালে বালাচন্দর একটি সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। স্বাতী তিরুনালের সংগীত বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও চিঠিপত্র সংকলিত একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন বালাচন্দর। সংবাদ সম্মেলনে পুস্তিকাটিকে সঙ্গীতবিদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, সঙ্গীত কলেজের অধ্যক্ষ, অল ইন্ডিয়া রেডিও, দূরদর্শন, সরকারি মন্ত্রী এমনকি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে খোলা চিঠি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি মাদ্রাজ হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন, যাতে ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট বইটির বিষয়বস্তু যাচাই করে তার অভিযোগ গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করে।

বিক্রম সম্পৎ লিখেছেন, ‘অন্তত আট বছর ধরে তার এই বিষয়টিই তার একমাত্র লক্ষ্য হয়ে ছিল। তিনি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি লিখেছেন, সংবাদমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন।’

এই ঘটনার এক বছর পরই বালাচন্দরের মৃত্যু হয়। তবে এই বিতর্কের প্রতি মানুষের আগ্রহ কখনও কমেনি। ২০১৩ সালে আবারও তা নতুন করে আলোচনায় আসে।

২০০০-এর প্রথম দশকের শুরুর কথা। অচ্যুতশঙ্কর নায়ার তখন সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অব ইমেজিং টেকনোলজির প্রধান। সেই সময় তিনি ভাইলোপ্পিল্লি সংস্কৃতি ভবনের সঙ্গে মিলে স্বাতী তিরুনালকে উৎসর্গ করে একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেন। ইন্টারনেটের প্রাথমিক যুগ। প্রযুক্তি ছিল সীমিত ও সীমাবদ্ধ। তার মধ্যেই ২৫০টি সঙ্গীত MP3 ফরম্যাটে আপলোড করা হয়। তারপরও এটি কেরালার তৃতীয় সর্বাধিক ভিজিট হওয়া ওয়েবসাইটে পরিণত হয়।

গত ২৫ বছরে ইন্টারনেট প্রভূত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। যথাযথ মেইন্টেনেন্স ও নানা অভাবে ওয়েবসাইটটি বন্ধ হয় যায়। সম্প্রতি নতুনভাবে চালু করা হলে অচ্যুতের গবেষণার ফলাফল অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

নায়ার স্বাতী তিরুনালের রচনার সত্যতা প্রমাণে একটি সূত্রের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ১৮৫৩ সালে, রাজার মৃত্যুর মাত্র সাত বছর পর, কানাক্কু কুমারন মার্থান্ডন মালয়ালম ভাষায় তার প্রায় ১০০টি গান প্রকাশ করেন। এছাড়া ১৮৫৯ সালে বীণা রামানুজ প্রকাশিত ত্যাগরাজের প্রথম সংকলনেও স্বাতী তিরুনালের একটি রচনা অন্তর্ভুক্ত ছিল।

নিজের বইয়ে নায়ার উপসংহার টানেন যে, এই রচনাগুলোর লেখকত্ব নিয়ে সন্দেহ নেই এবং এগুলোর সুর স্বাতী তিরুনাল দেননি—এমন বিতর্কেরও অবকাশ নেই।

নায়ারের গবেষণায় বিভিন্ন উৎসে স্বাতী তিরুনালের রচনা পাওয়া গেছে। তিনি জানান, তার দাদীর ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দের গানের বই ‘সংগীত গুণদর্শম’, উনিশ শতকের শিশুদের বই ‘বালবোধম’-এ স্বাতীর কিছু গান পেয়েছেন। অন্তত ডজনখানেক বই প্রকাশ হয়েছিল ১৯১৮ সালের মধ্যে। এর মধ্যে ১৯০৪ সালে মুথুস্বামী দীক্ষিতের বংশধরের লেখা একটি জীবনীও ছিল। নায়ার দৃঢ়ভাবে বলেন, ‘এসবই প্রমাণ করে ১৯৪০-এর দশকে তার খ্যাতি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হওয়ার এই অভিযোগ টেকে না।”

লিখিত প্রমাণের বাইরে, নায়ার স্টাইলোমেট্রি ব্যবহার করেন। এটি একটি পরিমাণগত ভাষাতাত্ত্বিক পদ্ধতি, যা শব্দভাণ্ডার ও বাক্যগঠনের নির্দিষ্ট ধরণ বিশ্লেষণ করে লেখকের পরিচয় নির্ধারণ করে। স্বাতী তিরুনালের কাজ বিশ্লেষণ করতে তিনি তার নির্ভুল রচনাগুলো থেকে ৫০টি শব্দ বেছে নেন—যেমন ‘শ্রী’, ‘জয়’ ও ‘পদ্মনাভ’। এই সূচকগুলো পুরো রচনাসমগ্রে প্রয়োগ করে (এমনকি বিতর্কিত অংশগুলোতেও) তিনি লেখকত্বের একটি গাণিতিক মূল্যায়ন করেন।

নায়ার বলেন, ‘এটি শতভাগ নির্ভুল পদ্ধতি নয়, তবে গবেষণা থেকে বোঝা যায় যে তার নামে প্রচলিত রচনাগুলোর মাত্র ১০% ক্ষেত্রে লেখকত্ব নিশ্চিত করা যায় না। কিন্তু সেই সময়ের অন্যান্য সুরকারদের ক্ষেত্রেও এটি স্বাভাবিক।’

নিজের বইয়ে নায়ার উপসংহার টানেন যে, এই রচনাগুলোর লেখকত্ব নিয়ে সন্দেহ নেই এবং এগুলোর সুর স্বাতী তিরুনাল দেননি—এমন বিতর্কেরও অবকাশ নেই।

মূলত স্বাতী তিরুনাল উনিশ শতকের প্রথমার্ধের উপনিবেশের কবলে পড়া রাজপরিবারের সদস্য-র এক ক্ল্যাসিক উদাহরণ। ভারতের বহু রাজপরিবারের সদস্যরা এই সময় যুদ্ধ, শাসন ইত্যাদির বাইরে গিয়ে শিল্প সাধনায় রত হয়েছিলেন। স্বাতীর জীবনের রাজনৈতিক ‘পার্ট’-এর পাঠ তাই পরিচিত। কিন্তু তার সংগীতের পরিচয় ও সংগীত পাঠ নানা কারণেই জটিল।

 

তথ্যসূত্র:

১. স্ক্রলে প্রকাশিত মালীনি নায়ারের নিবন্ধ
২. The Melodic Monarch–Swathi Thirunal Rama Varma by Hindu Post
৩. স্বাতী তিরুনাল সংগীত সভা

ট্যাগ: #ইতিহাস #সাহিত্য

সম্পর্কিত লেখা