ভারতের সিনেমায় দুর্গাপূজা
লেখক: মাহমুদ (Mahmud) · ১৪ অক্টোবর, ২০২৬ · বিভাগ: ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি
দুর্গাপূজার প্রসঙ্গ ভারতের অনেক সিনেমাতেই এসেছে। তবে এর মধ্যে বিশেষভাবে পাঁচটি সিনেমার নাম করতে হয়। জয় বাবা ফেলুনাথ, হীরের আংটি, উৎসব, কাহানি ও উমা। একেকটি সিনেমার গল্প একেক রকম কিন্তু দুর্গাপূজা প্রতিটিতেই প্রধান অনুষঙ্গ।
শারদীয় দুর্গাপূজার সঙ্গে বাঙালির আবেগ জড়িত। এ কালে এসে বাঙালি, বাংলাদেশী, পূর্ব বাংলা পশ্চিম বাংলা নিয়ে নানা বিতর্ক উঠতে পারে কিন্তু শারদীয় দুর্গোৎসবে সবাই কম-বেশি আনন্দ করে। তবে বিশেষভাবে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের কাছে এটি কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়; স্মৃতি, শিকড়, বাড়ি ফেরা, পারিবারিক পুনর্মিলন ও সম্মিলিত আনন্দের উপলক্ষ। ফলে ঢাকের শব্দ, প্রতিমার মুখ, প্যান্ডেলের আলো কিংবা বিসর্জনের বিষাদ—এসব অনুষঙ্গ সিনেমায় বারবার ফিরে এসেছে। তবে চলচ্চিত্রে দুর্গাপূজার গুরুত্ব শুধু দৃশ্যসজ্জায় সীমাবদ্ধ নয়। কখনো উৎসব গল্পের চালিকাশক্তি, কখনো চরিত্রের মনস্তত্ত্ব উন্মোচনের মাধ্যম। পাঁচটি উল্লেখযোগ্য সিনেমায় সেই বৈচিত্র্যই ধরা পড়ে।
দুর্গাপূজার প্রসঙ্গ ভারতের অনেক সিনেমাতেই এসেছে। তবে এর মধ্যে বিশেষভাবে পাঁচটি সিনেমার নাম করতে হয়। জয় বাবা ফেলুনাথ, হীরের আংটি, উৎসব, কাহানি ও উমা। একেকটি সিনেমার গল্প একেক রকম কিন্তু দুর্গাপূজা প্রতিটিতেই প্রধান অনুষঙ্গ।
জয় বাবা ফেলুনাথ
আজকাল পূজা আসার আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা যায়—পরশু তো ষষ্ঠী, আপনার কাজ শেষ হবে?
সত্যজিৎ রায়ের জয় বাবা ফেলুনাথ (১৯৭৯)-এ ঘোষালদের প্রতিমার কারিগর শশীবাবুকে এই প্রশ্ন করেছিলেন প্রদোষ মিত্র। ঘটনা কলকাতার না, বেনারসের। কিন্তু বহু বছর পেরিয়ে এই সংলাপ, ঘোষালদের প্রতিমা তৈরি, বেনারসের আবহাওয়া যেন দুর্গাপূজার অন্যতম উপস্থাপনা হয়ে উঠেছে।

বস্তত গোয়েন্দা গল্প হলেও এই সিনেমায় বাঙালি মানস উঠে এসেছে। ফেলুদা, তোপসে ও লালমোহনবাবুর বেনারস-অভিযানে দুর্গাপূজা, ধর্মীয় বিশ্বাস ও নগরজীবনের নানা অনুষঙ্গ রহস্যকাহিনির সঙ্গে মিশে গেছে।
সিনেমার অন্যতম বিশেষত্ব, দুর্গাপূজার আবহ এখানে কলকাতার পরিচিত পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়। কাহিনির পটভূমি বেনারস, প্রাচীন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এক শহর। তার ঘাট, গলি, মন্দির ও জনজীবন ছবিটিকে স্বতন্ত্র দৃশ্যগত পরিচয় দেয়। সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রে স্থান কখনো নিছক পটভূমি হয়ে থাকে না; পরিবেশও গল্পের অর্থ নির্মাণে ভূমিকা রাখে।
সত্যজিৎ রায় এই সিনেমায় দুর্গাপূজা নিয়ে খুব বেশিকিছু রাখেননি। কিন্তু সিনেমার প্রথম দৃশ্যেই দেখা যায় শশীবাবুর সঙ্গে রুকুর কথোপকথন। তিনি পুরাণের গল্প বলেন রুকুকে। দুর্গার সৃষ্টির কথা জানিয়েই অভিষেক হয় জয় বাবা ফেলুনাথের। এক-দেড় মিনিটেই দুর্গা, তার পরিবার আর দুর্গার ইতিহাসটা জানিয়ে দেন কিশোরদের উপযোগী গল্পে। আমাদেরও মনে হয়, দুর্গাপূজা না হোক—কখনো না কখনো আমরাও এভাবে গল্প শুনেছি।
হীরের আংটি
ঋতুপর্ণ ঘোষের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হীরের আংটি (১৯৯২)। শিশু-কিশোরদের উপযোগী এক কল্পনাপ্রবণ আখ্যান। এ সিনেমায় জয় বাবা ফেলুনাথের উল্লিখিত দৃশ্যের প্রভাব কিছুটা হলেও দেখা যায়। আর অন্যদিকে সিনেমাটির শুরু থেকেই শরতের আবেশ টের পাওয়া যায়। এরপর আসে শারদোৎসব, ছুটি আর পরিবারের একত্র হওয়ার গল্প।

শিশুদের কাছে পূজার সময়টা দৈনন্দিন জীবনের বাইরে এক বিশেষ জগৎ। স্কুলের ছুটি, আত্মীয়দের বাড়িতে যাওয়া, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় এবং বড়দের জগতের নানা ঘটনা তাদের কল্পনাকে প্রসারিত করে। যে ঘটনা বড়দের কাছে সাধারণ, শিশুর কাছে সেটিই হয়ে উঠতে পারে রহস্যময়। হীরের আংটির কল্পনাময় জগৎ এই অভিজ্ঞতার সঙ্গে সাযুজ্য তৈরি করে।
আর এ সিনেমাতেও আছে বনেদী বাড়ির প্রতিমা তৈরির দৃশ্য। সেখানে হাবুল ও তিন্নির কথোপকথন, হাবুলের মানস দর্শককে তার ছেলেবেলার উৎসবে নিয়ে যাবে।
উৎসব
দুর্গাপূজার উপস্থাপন আছে ঋতুপর্ণ ঘোষের উৎসব (২০০০) সিনেমাতে। এটি পুরোপুরি পারিবারিক, জটিল সংকট ও মনস্তত্ব নিয়ে তৈরি। দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে একটি পরিবারের অন্তরঙ্গ আখ্যান। পূজার ছুটিতে পুরোনো বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের সমাগম ঘটে। বাইরে উৎসবের প্রস্তুতি, প্রতিমা ও আচার-অনুষ্ঠানের ব্যস্ততা; ভেতরে জমে থাকে অভিমান, সম্পত্তির হিসাব, অর্থনৈতিক সংকট এবং সম্পর্কের টানাপোড়েন।
দুর্গাপূজা মানেই বাড়ি ফেরা। দূরে থাকা মানুষ এই সময় শিকড়ের কাছে ফিরে আসেন। কিন্তু একই ছাদের নিচে একত্র হলেই কি সম্পর্কের দূরত্ব ঘুচে যায়? উৎসব এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায় দর্শককে। উৎসবের উপলক্ষ পরিবারের সদস্যদের কাছাকাছি আনে ঠিকই, কিন্তু তাদের মধ্যকার অস্বস্তি ও বিচ্ছিন্নতা সহজে মুছে যায় না।

এ সিনেমায় ঢাকের শব্দ আছে, পাটভাঙা শাড়ি আছে, উৎসবে বিভিন্ন বয়সের মানুষের ভিন্ন মানসের উপস্থাপনও আছে। ঋতুপর্ণের বিশেষত্ব হলো, পরিচিত সামাজিক পরিসরের মধ্যেই মানুষের মনস্তত্ত্বের সূক্ষ্ম স্তরগুলো আবিষ্কার করা। এই ছবিতে দুর্গাপূজা তাই আনন্দের পাশাপাশি বিষণ্নতারও অনুষঙ্গ। পুরোনো বাড়িটি যেন হারিয়ে যেতে থাকা ঐতিহ্যের প্রতীক। সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া সম্পর্কের মধ্যেও পূজা সবাইকে এক জায়গায় ফিরিয়ে আনে। উৎসব দেখায়, উৎসবের প্রকৃত গল্প অনেক সময় প্রতিমার সামনে নয়, পরিবারের মানুষগুলোর পরস্পরের মুখোমুখি হওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।
কাহানি
সুজয় ঘোষের হিন্দি সিনেমা কাহানি (২০১২)। সিনেমাটা থ্রিলার কিন্তু একে কলকাতার একটা ডকুমেন্টারি বললে ভুল হয় না। সেই সঙ্গে আছে দুর্গাপূজা। বিদ্যা বাগচীর অনুসন্ধানের পটভূমিতে রয়েছে উৎসবমুখর শহর—আলোকসজ্জা, প্যান্ডেল, জনসমাগম এবং বদলে যাওয়া নগরজীবন।
দুর্গাপূজার সময় কলকাতার স্বাভাবিক ছন্দ পাল্টে যায়। রাস্তায় মানুষের ঢল নামে, যান চলাচলের ধরন বদলায়, পরিচিত শহর হয়ে ওঠে নতুন অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র। কাহানি এই বাস্তবতাকে রহস্য নির্মাণে কাজে লাগায়। যে জনসমাগম উৎসবের আনন্দ বাড়ায়, সেই ভিড়ের মধ্যেই কাউকে খুঁজে পাওয়া কঠিন। শহরের রঙিন দৃশ্যের আড়ালে চলতে থাকে সন্দেহ, অনুসন্ধান ও বিপদের আশঙ্কা।

ছবিটির আরেকটি শক্তি হলো, কলকাতার দুর্গাপূজাকে শহরের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হিসেবে তুলে ধরা। পূজা এখানে বিচ্ছিন্ন কোনো ধর্মীয় আয়োজন নয়; এটি জনজীবন, নগর-নান্দনিকতা ও সামাজিক গতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত। উৎসবের উচ্ছ্বাস এবং থ্রিলারের অনিশ্চয়তা পাশাপাশি রেখে কাহানি দেখায়, পরিচিত সাংস্কৃতিক পরিসরও কীভাবে রহস্যময় হয়ে উঠতে পারে।
উমা
পুরাণে দুর্গাপূজা হতো বসন্তকালে। রাম অকালবোধন করে দুর্গাপূজা করেন শরতে। তাহলে অন্য সময় কেন দুর্গাপূজা করা যাবে না? যেখানে কারো বাঁচা মরার প্রশ্ন? সৃজিত মুখার্জির উমা (২০১৮) দুর্গাপূজার মানবিক তাৎপর্যকে সরাসরি সামনে আনে। অসুস্থ মেয়ের ইচ্ছা পূরণ করতে তার বাবাও করেন অকালবোধন। প্রবাস ছেড়ে কলকাতায় ফিরে শহরের একাংশকে সাজিয়ে ফেলেন দুর্গাপূজার আবহে।

বাঙালির দুর্গাপূজা সাধারণত শরতের নির্দিষ্ট সময়কে কেন্দ্র করে পালিত হয়। সেই সময়ের বাইরে পূজার আয়োজনের ধারণাই ছবিটিকে বিশেষ মাত্রা দেয়। তবে উমার মূল বক্তব্য কেবল ব্যতিক্রমী আয়োজন নয়; বরং একটি শিশুর আনন্দকে ঘিরে বহু মানুষের একত্র হওয়া। ব্যক্তিগত সংকটের মধ্যেও অন্যের প্রতি ভালোবাসা কীভাবে সম্মিলিত উদ্যোগের জন্ম দিতে পারে, ছবিটি তারই গল্প বলে।
এই পাঁচটি সিনেমায় দুর্গাপূজার উপস্থাপনা এক রকম নয়। উৎসব-এ তা পারিবারিক সম্পর্কের আয়না, হীরের আংটিতে শৈশবের কল্পনাময় জগতের অনুষঙ্গ, জয় বাবা ফেলুনাথ-এ রহস্যের সাংস্কৃতিক পটভূমি, কাহানি-তে নগরজীবন ও থ্রিলারের মেলবন্ধন, আর উমা-তে মানবিক ভালোবাসার প্রতীক।
এর বাইরেও কিছু সিনেমায় দুর্গাপূজার প্রসঙ্গ এসেছে। স্মরণ করা যায় সঞ্জয় লীলা বানসালির ‘দেবদাস’। বিথ্যাত ‘ডোলা রে’ গানটি দুর্গাপূজার সময়কারই উপস্থাপন। কৌশিক গাঙ্গুলির ‘বিসর্জন’, অপর্ণা সেনের ‘পরমা’ও দুর্গাপূজার আবেশ নিয়ে আসে। হিন্দিতে সম্প্রতি ‘রকি অউর রানী কি প্রেম কাহানি’তে দুর্গাপূজা এসেছে। এছাড়াও ছিল প্রদীপ সরকারের ‘পরিণীতা’, বিক্রমাদিত্য মোতওয়ানের ‘লুটেরা’ ও আলী আব্বাস জাফরের ‘গুন্ডে’তে।