মাহমুদের মহাফেজখানা (Mahmud Writes) · সকল লেখা · বই

গোধূলির আগে

লেখক: · ১৭ এপ্রিল, ২০২৬ · বিভাগ: গল্প

কফিশপে এক কাপল

দুই তরুণের গল্প। প্রেমিক প্রেমিকার গল্প। আমাদের দেশে সমবয়সীদের প্রেম এখনো সব সময় পূর্ণতা পায় না। তাদের সেই প্রেম জটিলতা, টিকিয়ে রাখা ও থেকে যাওয়ার গল্প...

বাস থেকে নামার সময় পাঞ্জাবীর বাম পকেটের পাশটা ফেঁসে গেল। বিকেল তখন গড়াতে শুরু করেছে। এমন সময় একটা মন খারাপ করা ব্যপার থাকে। সেই মন খারাপে ভর করেই হয়ত আনমনা ছিল আকিব। তাই ফাঁকা বাস থেকে নামতে গিয়েও খেয়াল করেনি নিজের দিকে। ছিঁড়ে ফেলল পাঞ্জাবিটা। ‘ফ্যাঁস’ করে শব্দ হতে ফিরে তাকিয়েছিল। তারপর কাকলীর মোড়ে একটু স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ভালো করে দেখে আকিব। ‘না, খুব একটা ছেঁড়ে নাই। আরামসে চালিয়ে দেওয়া যাবে’, আপন মনে কথাগুলো বলে। সামনে তাকিয়ে দেখে আজকে রাস্তায় তেমন জটলা নেই। এখানে তো এমন হয় না। বেশ ভিড় হয় সব সময়। হয়ত রাস্তারও মন খারাপ আজ। কিংবা মানুষের মন খারাপ, তারা বেরোয়নি পথে।

আকিবের মাঝে মাঝে এমন হয়। এক কথা ভাবতে গিয়ে আরেক কথা ভাবতে শুরু করে। তার তখন সময়ের কোনো তালগোল থাকে না। ইদানীং রোগটা আরো বেড়েছে। অবশ্য একে হয়ত রোগ বলা যায় না। মানুষ বলে—কবি কবি ভাব। আজকে তাকে দেখতেও অমনই লাগছে। খোঁচা খোঁচা দাড়ি হয়েছে মুখে। মনে হচ্ছে এই মানুষ নিজের দিকে খেয়াল রাখে না। কিন্তু আসলে আকিবের মনে যে ঝড় চলছে, সেই ঝড়ের কারণেই তার এই অবস্থা সেকথা তো সবাই জানবে না। অবশ্য জানার বিশেষ প্রয়োজন নেই।

এমনিতে শহরের মানুষ কখনো অন্যের মনের খবর নিতে চায় না। নেওয়ার ইচ্ছা নেই। গ্রামে হলে অন্য বিষয় ছিল। দোকানের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে কেউ ডেকে জিজ্ঞেস করত, ‘মিয়াঁর ব্যাটা না! মুখের অবস্থা ওই রকম কেন?’

গ্রামের মানুষেরও প্রয়োজন নেই আকিবের মনের খবর জানার। কিন্তু মুখ যেহেতু মনের দর্পণ, তার শুকনো মুখ দেখে কিছু প্রশ্ন শুনতে হতো। শুনে এসেছে সে। আর বাজারের কাছে পুলে বসে থাকলে তো জয়নাল, মঈন, শিরাজ ছেঁকেই ধরত। কিন্তু এখানে তারা কেউ নেই। আকিবের জীবন থেকে তারা হারিয়ে গিয়েছে বছর সাতেক আগে। উপজেলা থেকে রাজধানীতে এসে কলেজে ভর্তি হওয়ার পর। তারপর দিনে দিনে শিখে গেছে, শহর কেবল প্রয়োজন বোঝে, ভাবালুতা না।

মিলি সাধারণত কোনো কারণ ছাড়া কাজ করে না। আকিবের মাথায় প্রথম যে বিষয়টা আসে সেটা স্বাভাবিকভাবেই চরম একটা সম্ভাবনা। মিলি হয়ত শেষ করে দিতে চায় সম্পর্কটা। তাই যেখান থেকে শুরু হয়েছিল সেখান থেকেই শেষ করবে। এই প্রবণতা আছে মিলির।

এই প্রয়োজনের বিষয়টা মনে করেই আকিবের মনে হয় তার আসলে কোথাও যেতে হবে না। এখানে সে ভুল করে এসে পড়েছে। তার এখানে থাকার কথা না। কিন্তু এখান মানে কোন খান? এই শহর? নাকি শহরের বনেদী এলাকা বনানী? আসলে কোনোটাই না। আকিব নিজেকে বোঝাতে চায়, তার কীসে প্রয়োজন আর কীসে প্রয়োজন নেই।

আসলে আজকে যেখানে সে যাচ্ছে সেটা এক হিসেবে তার গন্তব্য। যদিও আকিব জানে সে পৌঁছতে পারবে না। কারণ, তার মতো মানুষ সহজে গন্তব্যে পৌঁছতে পারে না। তাদের জন্য অনেকে অপেক্ষা করে থাকলেও তারা পিছিয়ে যায়। সেই পিছিয়ে যাওয়া দেখতে হলেও মাঝে মাঝে আকিবদের আগাতে হয়। তাই অনেক কিছু ভাবতে ভাবতেই এগারো নম্বর রোডের দিকে হাঁটতে শুরু করে আকিব।

 

এদিকটায় আসা হয়নি অনেকদিন। অনেক বলতে বছর খানেক। দরকার পড়ে না বলে আসা হয় না। জীবনে অনেক সময় পুরনো পথগুলো হারিয়ে চায়। চেনা পথ অচেনা হয়ে যায়। এখানেও সেই রকম ব্যপার। পথে চলতে প্রতিটা কদমেই একথা মনে হয় তার। পথে নতুন দোকান হয়েছে, দেওয়ালের বদলে গেছে লেখা। এসব সে দেখেনি। মিলির ক্যাম্পাস এখানে থাকাকালীন মাঝে মাঝেই আসা হতো। মিলির গ্র্যাজুয়েশন শেষ, এখন আর আসা হয় না। আজ এলো। একটা সিগারেট ধরাতে গিয়ে আকিবের হঠাৎ মনে হয় মিলি এখানেই আজ দেখা করতে চাইল কেন?

হয়ত কোনো কারণ আছে। মিলি সাধারণত কোনো কারণ ছাড়া কাজ করে না। আকিবের মাথায় প্রথম যে বিষয়টা আসে সেটা স্বাভাবিকভাবেই চরম একটা সম্ভাবনা। মিলি হয়ত শেষ করে দিতে চায় সম্পর্কটা। তাই যেখান থেকে শুরু হয়েছিল সেখান থেকেই শেষ করবে। এই প্রবণতা আছে মিলির। সেজন্যেই ডেকেছে এই জায়গায়!

চারপাশটা আবার ভালো করে দেখে আকিব। একটা রিকশা চলে গেল। রোদ পড়ে চাকার স্পোকের ছায়া পড়েছে রাস্তায়। সামনে অনেকটা রাস্তা ফাঁকা, কোনো যানবাহন নেই। সিনেমার একটা ফ্রেম মনে হয়, একটা শট মনে হয় দৃশ্যটাকে। কার সিনেমা হতে পারে? আব্বাস কিয়ারোস্তমির কথা মনে আসে তার। এমনিতে সিনেমা খুব একটা বোঝে না কিন্তু ভাবনায় চলে আসে আকিবের।

ভাবতে ভাবতেই দেখা গেল মিলি দাঁড়িয়ে আছে ফুটপাত ঘেঁষে। এভাবে যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা মিলির নিজেরই পছন্দ না। রাস্তার পাশে সে দাঁড়ায় না কখনো। তাও আজ কেন দাঁড়িয়েছে সে-ই জানে। আকিবের মনে হতে থাকল, আজ সবই বিসদৃশ। কেননা শাহবাগ থেকে আসার সময় বাসে সিট পেয়েছিল। একটা মেয়ে তার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসেছে।

ছয় মাস হয়, নিজের সঙ্গে ভালো কিছু ঘটতে দেখেনি আকিব। আজো সে আশা করেনি। তবু মনে হচ্ছিল দিনটা সুন্দর। মন-খারাপি হলেও সুন্দর। কিন্তু এখানে এসে মিলি সংক্রান্ত সম্ভাবনা তাকে ফের উল্টো ভাবতে বাধ্য করল। অবশ্য তাতে কিছু আসে যায় না আকিবের। এসব সে মেনে নিয়েছে অনেককাল ধরে। এখন আর কোনো কিছু নিয়ে মাথা ঘামাতে ইচ্ছা করে না। অন্তত এইসব মন সংক্রান্ত বিষয়ে তো কখনো না। তার মন বলতে কিছু আছে, আকিব সেটাই ভুলে যেতে চায়।

মিয়াঁর ব্যাটা আকিবের তেমন কিছুর অভাব হতো না। মিয়াঁর ব্যাটা বলেই সুযোগ পেয়েছিল শহরে এসে পড়াশোনা করার। ধানের টাকা, পাটের টাকা কিছুই নেই অবশ্য মিয়াঁর। ছিক এক প্রচণ্ড জাত্যাভিমান। দুই পুরষের আইএ আর এক পুরুষের বিএ পাশ মিয়াঁদের পরিবার। চতুর্থ পুরুষকে তাই আরো উচ্চশিক্ষিত করার বাসনা ছিল ছোট মিয়াঁর। নিজে চলে গিয়েছিল অকালে। ছেলের জন্য রেখে গিয়েছিল কেবল ভিটার এক টুকরো জমি। কিন্তু জোহরা তার পরও ছেলেকে পড়িয়ে গেছে বুকে আশা বেঁধে। সেই ছেলেই শহরে এসে তিন বছরের মাথায় জুটে গিয়েছিল রাজনীতিতে। সংস্কৃতি আর রাজনীতির মধ্যে মেলবন্ধন ঘটাবে—গত চার বছর ধরে এ-ই তার ধ্যান জ্ঞান। বাকি সব সে ভুলে যেতে চায়।

তবু চাইলেও ভুলে যাওয়া যায় না। কেননা দুই মাস পর মিলিকে দেখে তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠে। আকিব এর মানে জানে কিন্তু পাত্তা দিতে চায় না। নিজেকে স্বাভাবিক করতে চেষ্টা করে। বিকেলের আলোয় তাকে দেখে মিলি বুঝতে পারে, নিজের ওপর জোর করছে ছেলেটা।

 

‘হঠাৎ এমন জরুরী তলব যে?’, আকিব নিজে থেকেই প্রশ্ন করল হালকা চালে।

‘কেন? কোন রাজকার্যটা ফেলে আসতে হলো তোমাকে?’, বাঁকা স্বরে উল্টো প্রশ্ন মিলির।
‘বেকার বলে আর কত খোঁটা দিবি? তাও তোর মতো আধুনিক মেয়ে এই কথা বলছে সুচিত্রা সেনের স্টাইলে। হইল না মামা!’, বলে হাসে আকিব। কলেজের বন্ধু, তারপর তিন বছরের প্রেমের পর এখন তুই আর তুমির কোনো হিসাব থাকে না। যখন যেটা মুখে আসে সেটাই বলে ফেলে।

বেকারত্বের বিষয়টা বলেই আকিবের মনে হলো, কাজটা ঠিক হলো না। তাই তাড়াতাড়ি শুধরে নিয়ে বলল, ‘চেষ্টা তো করছি কিছু করার।’
মিলি সামনে পা বাড়াতে বাড়াতে বলল, ‘আমি কিন্তু কিছু বলি নাই। নিজে থেকে নিজেরে প্যারা দিতে চাইলে তো কিছু করার নাই আমার। দুই সপ্তাহ সমানে দেখা করতে বলার পর আজকে আসছিস। রাজকার্য না থাকলে কেউ এমন করে বইলা তো মনে হয় না আমার। সেইটা বলতে টাইনা আনতাছ বেকারত্ব! তোদের শালা সমস্যাই এইটা। সবখানে মাইনকা চিপা দিয়া বেকারত্ব, অসম বণ্টনের আলাপ না দিলে শান্তি হয় না!’

স্বর তেতে উঠছিল মিলির। সে নিজেও বুঝতে পারছিল। ইদানীং মেজাজ ঠিক থাকে না। সামনের গলিটার মুখে এসে একটু দাঁড়াল। একটা গাড়ি পার হলো আর সেই সময়ে নিজেকেও একটু শান্ত করে নিল মিলি। চট করে একবার তাকিয়ে নিলো আকিবের মুখে। সেখানে অপ্রস্তুতের অভিব্যক্তি। ভালোই লাগল মিলির।

আকিব নিজেকে সামলানোর কোনো চেষ্টা করল না। সে নিজের মতো করেই বলল, ‘এখন তো সব জায়গাতেই নানা ফ্যাঁকড়া। কাজ পাওয়া যায় কিন্তু করতে পারি না বেশিদিন।’

‘তোমার যে চুলের আদর্শ!! তুমি আর কিছু করছো!’, রীতিমত গরম এবার মিলির স্বর। হওয়ারই কথা। শেষ চাকরিটা আকিব করেছে মাত্র উনিশ দিন।


অবশ্য এর পেছনে আকিবের নিজস্ব যুক্তি আছে। তা নিয়ে অন্যদের সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছা আকিবের নেই। সে গম্ভীর হয়ে বলল, ‘এসব বলতে ডাকিস নাই। টপিক বদলা।’
‘রাস্তায় দাঁড়িয়েই শুনতে হবে?’, চোখে এবার নরম আলো আসে মিলির।
‘কই বসবি?’, স্বাভাবিক স্বরেই জিজ্ঞেস করে আকিব। যেন আগের কথাগুলো তারা কেউ বলেনি। কিছুক্ষণ আগে হাতে হাত ধরে হেঁটে আসছিল তারা নতুন প্রেমিক প্রেমিকার মতো।

‘যেখানে বসে সিগারেট টানতে পারব’, বলে হাসে মিলি। মিষ্টি হাসলে ওকে অদ্ভুত সুন্দর লাগে। তবে আকিবকে বলার দরকার ছিল না। বনানীটা আকিবের চেয়ে মিলি ভালো চেনে। কোথায় বসলে সিগারেট খাওয়া যাবে, কোথায় বসে বিয়ার খেতে হয় সেসব আকিবকে মিলিই শিখিয়েছিল। আজকেও কোথায় বসবে তা মিলি ঠিক করেই এসেছিল মনে মনে, আকিব জানে। তবু ওইটুকু আকিবকে ওভাবে বলা মিলির স্বভাব। যেন আকিবকে সে সব সময় বলতে চায়, এই কাজগুলো আকিবেরই ভেবে রাখার কথা।

 

নীরবে ওরা দুজনে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যায়। এদিকে এখন অনেক দামী দামী রেস্তোরাঁ আছে। আকিবের অবশ্য ধারণা রেস্তোরাঁ বলতে আসলে যা বোঝায় এগুলোকে সে রকম কিছুতেই বলা যায় না। আবার কফি শপ বলা চলে না সবগুলোকে। কোথাও নানা অদ্ভুত স্বাদের চা, কঠিন কঠিন ইংরেজি নামের কফি পাওয়া যায় সেই সঙ্গে থাকে বিদেশী ‘স্ন্যাক্স’, আকিব সবগুলোর নামও জানে না। আগে যা ছিল এখন তা থেকে আরো বেশি কতগুলো গজিয়ে গেছে।

মিলির বেশ পছন্দ এসব জায়গা। অথচ আকিব নিজে থেকে কখনও ঢোকে না। এখানেই মিলির সঙ্গে তার ফারাক। এক কাপ কফি দুইশ টাকায় কিনতে তার বরাবরই গায়ে লাগে। তবু মিলির সাথে এসেছে অনেক সময়। গত চার বছর, মানে মিলি যতদিন তার বনানী ক্যাম্পাসে ছিল, এদিকে এসেই অনেকদিন দেখা করেছে ওরা। ফলে বসতে হয়েছে। এখানে তো খালি মাঠ নেই, কিংবা ফুটপাতে বসাও যায় না। মিলি যেমন, তাকে নিয়ে অবশ্য বসত না আকিব নিজেও। সেজন্যই তো কখনো ওকে নিয়ে রমনায় যায়নি, সোহরাওয়ার্দিতে বসেনি। মিলির অবশ্য নিজের কোনো আপত্তি ছিল না। আকিবই নিয়ে যায়নি। সে হয়ত মিলির সাথে কাটানো সময়টার পারিপার্শ্বিকের নীরবতা চাইত। কিন্তু সেটা কেনার জন্য যে জায়গাগুলো আছে, তা আকিবের পছন্দ ছিল না। তাই মিলির পছন্দেই সে মত দিত।

আজও একটা নামী কফি শপে বসল ওরা। এখানে দারুণ ব্যবস্থা। একদিকে শুধু কফি-প্রেমিদের জায়গা। অন্য দিকে ছোট করে ধূমপায়ীদের বসার ব্যবস্থা। এর আগে বেশ কয়েকবার এসে আকিবের মনে হয়েছে এসব কফি শপের ‘স্মোকিং জোন’ বানানো হয়েছে বড়লোকের উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েদের সিগারেট খাওয়ার জন্য। কেননা আজও আকিব দেখে যারা বসে আছে আর ধোঁয়া ওড়াচ্ছে তারা আকিবদের চেয়ে অন্তত ছয় সাত বছরের ছোট।

 

‘তোর উপন্যাসটার কী খবর?’, কফির কাপ টেনে নিয়ে মিলি জিজ্ঞেস করল। চোখে সত্যিকারের আগ্রহ, তাতে কোনো সন্দেহ আকিবের মতো সন্দেহপ্রবনেরও মনে জাগে না।
‘আঁটকে আছি। জট লেগে গেছে। মাঝে চাকরীর চেষ্টা করতে করতে..’, মিলি ব্যাগ থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করলে থেমে যায় আকিব।
‘মার্লবরো খাচ্ছিস আজকাল?’
‘হ্যাঁ’, মিলি বলে, ‘এটাই ভালো লাগে’, বলে নিজেই একটা বের করে নেয়। ধরায় না, হাতে রাখে। তারপর আবার বলে, ‘তুই একটা ব্যবসার কথা না ভাবছিলি? নিলয়, প্রতীক আর ফাইজার সাথে?’

আকিব হাসে। বলে, ‘কথা অনেক হলো, বনিবনা হয় না।’

মিলি ততক্ষণে সিগারেট ধরিয়ে টানটে শুরু করেছে। সেদিকে তাকিয়ে আকিব বলে, ‘এতো খাস্ না, মিলি। ক্ষতি হবে।’

‘কার? আমার?’, মিলির কণ্ঠে পরিহাস না আশঙ্কা, আকিব বুঝতে পারে না।

খানিকটা বিরক্তের মতো আকিব বলে, ‘আমি কী বলছি, সেটা তুইও জানিস।’

মিলি হাসে এবার। হাসতে হাসতেই বলে, ‘কিন্তু তুই কী করে জানিস? আন্দাজ?’

অবশ্য এ প্রশ্ন মিলির করার কথা না। আকিব ভুলোমনা, কেয়ারলেস হলেও কিছু জিনিস সে মনে রাখে তা মিলিও জানে। তবু সে পরখ করতে চায় আকিবকে। তাকিয়ে থাকে তার দিকে। আকিবের মুখের রেখা পড়ার চেষ্টা করে। সেটা অবশ্য মিলির জন্য কঠিন। এই ছেলের মুখ দেখে সে কখনো খুব বেশি কিছু পড়তে পারে না।

আকিবও তাকায়। বলে, ‘হয়তো তাই।’

আকিবের উদাসীনতা ছড়িয়ে পড়ে যেন কফিশপের স্মোকিং জোনে।

নিজের সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে নিভিয়ে আদুরে প্রেমিকার মতো ঘাড় ক্যাঁৎ করে মিলি বলে, ‘তুমি তো গোল্ডলিফ ছাড়বে না। তুমি টানলে ক্ষতি হবে না?’

নিরুত্তর আকিব আঙুলের মাঝে তার সিগারেট নিয়ে বসে থাকে। কফি শপের কুলারের সামান্য আওয়াজ শোনা যায়। বসে থাকা অন্য সবাই চলে গেছে। আজ কেন যেন কফি খাওয়ার লোক নেই। শহরের মানুষগুলো গেল কই! এইসব ভাবতে ভাবতে আবার আনমনা আকিব। মিলিও সেটা দেখে। আকিবের আনমনা হয়ে যাওয়া সে দেখেছে বহুদিন ধরে। এই অবস্থাটা সে চেনে। এই সময় একদমে অনেক কিছু চিন্তা করে ফেলে সে। দুই একটা সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলে। হয়ত বলে না, সঙ্গে সঙ্গে করেও না। কিন্তু সিদ্ধান্ত বদলায় না।

 মিলি, মনে হচ্ছে হেমিংওয়ের চরিত্র হয়ে বসে আছি আমরা। ‘‘হিলস লাইক হোয়াইট এলিফ্যান্ট’’, তোমাকে পড়তে দিয়েছিলাম। ওখানেও দুজন মানুষ এভাবে বসে কথা বলতে থাকে

‘বাবা তোমার কথা জিজ্ঞেস করছিল’, আকিবের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল মিলি।
আকিব অনর্থক হেসে বলে, ‘কেন? তার কি ধারণা, আমি একদমই বখে গেছি?’
মিলির চোয়াল খানিক শক্ত হয়ে ওঠে। সবকিছু নিয়ে সব সময় আকিবের এই তাচ্ছিল্য মাঝে মাঝেই বিরক্ত লাগে তার। আকিব সেকথা ধরেই বলেছিল, বিয়ে করে ফেললে একসঙ্গে থাকতে এই তাচ্ছিল্য দেখতে গিয়ে মিলির আরো মেজাজ খারাপ হবে। মিলি কিছু বলেনি সে কথার জবাবে।

‘তোমার কাছের মানুষরা যদি সেটা বলে বেড়াতে পারে, আমার বাবা ভাবলেই বা দোষ কী?’, মিলি শক্ত করে বলে। কেননা যাদের সঙ্গে মিলে দুনিয়া বদলানোর স্বপ্ন দেখছিল আকিব, তাদের কেউই আর আকিবের সঙ্গে নেই। আর এর বাইরেও আছে কিছু মানুষ। তাদের আকিব নিজের মানুষ মনে করত। কিন্তু ওদের কাছে আকিবের দাম নেই। নিজের নিজের ব্যবস্থা করে নিয়েছে তারা।
মিলির খোঁচা হজম করল না আকিব। উল্টো হুল বেঁধাতে বলল, ‘তবে আর কি! তৌহিদ সাহেবের চারধারে তো সুপাত্রের অভাব নাই। তার কন্যাও সুন্দরী। পাত্রস্থ করলেই হয়।’

‘অযথা রেগে যাচ্ছ!’, থামাতে চায় মিলি।

মিলির চোখে ক্লান্তির ছাপ খেয়াল করে আকিব। মনে হয় চেয়ারে হেলান দিয়ে ও ঘুমিয়ে যাবে। মিলিও দেখে আকিব তাকে দেখছে। আকিবের চোখে বিশ্বাস, ভালোবাসা। কিন্তু কোথাও এক শূন্যতা। কিছু একটা বলতে হয়।

‘এদের কফিটা আগের মত নেই আর’, মিলি বলে।
আকিব কিছু বলে না। তারপর প্রশ্ন করে, ‘মিতার সাথে কথা হইছে তোমার?’
‘হ্যাঁ। বলল, সামলে নিতে পারবে।’
‘তুমি ভেবে দেখেছ, মিলি?’, কেমন যেন মরিয়া শোনাল আকিবের স্বর।

 

আলো কমে আসছিল। আরো মোলায়েম হয়ে আসছিল। কফি শপের বারান্দায় একটা মায়াবী আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে এরা। দূর থেকে কোনো সুর ভেসে আসে না এই শহরে কিন্তু আকিবের মনে হয়, কোথাও থেকে আব্বাসউদ্দিনের গলায় ‘ওকি একবার আসিয়া, সোনার চাঁদ মোর যাও দেখিয়া…’ ভেসে আসছে। খুব নিচু লয়ে। যেমন শীতের রাতে হাওয়া বয়।

শীতল সে হাওয়ার সুর তাল কেটে দেয় মিলির গলা।
‘হ্যাঁ, ভেবেছি অনেক’, বলে খানিক চুপ করে থাকে মিলি। তারপর বলে, ‘একবার মনে হয় এটা পাপ। আবার মনে হয়, এটাই বাস্তব.... একটা দে। আমার প্যাকেট ফাঁকা।’
‘খেয়ো না’, অনুনয় করে আকিব।
‘থাকবে না তো আর ক’দিন পর। তাহলে সমস্যা কী?’, মিলির কণ্ঠে রাগ নেই, ক্ষোভ নেই।
‘রাখতে পারি না? আমাদেরই তো অংশ। একটা জীবন, তৈরি হচ্ছে তোমার ভেতরে। আমরাই তৈরি করছি, না বুঝেই হোক’, আকিবের কণ্ঠে আকুলতা।
‘তুমি কবে থেকে প্রো-লাইফ হলে?’, এবার ব্যঙ্গই করে মিলি।

প্রয়োজনে অ্যাবরশন যে স্বাভাবিক তা নিয়ে আকিব একবার তার বন্ধুদের সঙ্গে খুব তর্ক করেছিল। আজ কী সেই শক্তি নেই তার মনে?

আকিব নিজেও হয়ত সেকথাই ভাবছিল।

‘না, নিজের অংশ বলেই হয়তো..’, আকিব থেমে যায়।
‘আকিব, সামাজিক স্বীকৃতিটা দিতে পারবি এই মুহূর্তে?’, মিলি বিতার্কিকের ভঙ্গীতে প্রশ্নটা করে।
‘হাহাহাহাহাহা’, বেপরোয়া হাসে আকিব।

‘হাসছিস কেন, আকিব?’, মিলির চোখে দুঃখ খেলা করে।
আকিব থেমে যায় সামান্য।

তারপর স্বাভাবিক মুখ করে বলে, ‘মিলি, মনে হচ্ছে হেমিংওয়ের চরিত্র হয়ে বসে আছি আমরা। ‘‘হিলস লাইক হোয়াইট এলিফ্যান্ট’’, তোমাকে পড়তে দিয়েছিলাম। ওখানেও দুজন মানুষ এভাবে বসে কথা বলতে থাকে।’

মিলি ঠিক বুঝতে পারে আকিবের মধ্যে ঝড় চলছে। কিন্তু ঘরের খেয়ে বনের মোষ তারিয়ে বেড়ানো এই ছেলে এখন কিছুই বলবে না। মিলিকে তার জখমে মলম লাগাতেও দেবে না। মিলি নিজেও জানে তার সামনে বসা ছেলেটার কষ্ট কম হচ্ছে না।

কিন্তু মিলির বাবা তো বলেই দিয়েছে আকিবকে সে মেনে নেবে না। আকিবের পরিবারের যে অবস্থা, আকিবের ইচ্ছে থাকলেও মিলিকে নিয়ে তুলতে পারবে না।

কীভাবে যে সেদিন কী হয়ে গেল!

‘কিন্তু হয়ে যাওয়ার পরও তো তিনদিন সময় ছিল। কেন সে কিছু করল না?’

মিলির মনে হয় সেদিনের ভালোবাসাবাসি মিলির মাঝে অন্য এক চাওয়া এনে দিয়েছিল। আর কিছু সে ভাবতে পারে না।

নিস্তব্ধতা ভেঙে তখন আকিব বলে, ‘বিল দে। এসব পশ দোকানের বিল দেয়ার পয়সা আমার নাই।’

 

ওরা বের হয়ে এদিক সেদিক হাঁটতে হাঁটতে বিকেল গড়িয়ে যায়। এলোমেলো কথাটা ঘুরে ফিরে যায়। হই হই করে সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগে। শহরে আজ লোকজনের কমতি। বনানীর এই রাস্তায় অনেকটাই ফাঁকা। হাঁটতে ভালো লাগে দুজনেরই।

‘মিতা বলেছে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব সেড়ে ফেলা উচিত। পরে সমস্যা হতে পারে’, বনানী ব্রিজের উপর হাঁটতে হাঁটতে আকিবের হাত ধরে মিলি।
‘বাবার সাথে কথা বলি?’, আকিবের গলা শুষ্ক শোনায়।
‘মানবে না। পালাতে হবে। এভাবে আসলেও কি হয়, আকিব? তোমার তো ফ্যামিলির প্রতি একটা দায়িত্ব আছে। সেগুলো না করে বিয়ে করে ফেললে…’

থেমে যায় মিলি। গলার মধ্যে কিছু একটা আঁটকে যায় ওর। সন্ধ্যার ডাক আসছে তখন। আকিব মুঠোর মধ্যে শক্ত করে মিলির হাত ধরলে মিলি বলে, ‘আমরা তো আর কেউ কাউকে ছেঁড়ে যাচ্ছি না। আমাদের আবার হবে।’

মিলি হাসার চেষ্টা করে। আকিব শুকনো গলায় বলে, ‘কবে যাচ্ছিস মিতার কাছে?’

‘জানি না’, মিলি চুপ করে যায়।
আকিব দাঁড়িয়ে পড়ে। মিলির কাঁধে হাত রেখে বলে, ‘যাস না। একটা চাকরী নিয়ে নেবো। যা পাবো তাই করব।’

‘পারবে না তুমি। তোমার লেখা, সিনেমা বানানোর ইচ্ছা, রাজনীতি… আমিও চাই না এসব ছেড়ে একটা গড়পড়তা মানুষ হও তুমি।’

‘গড়পড়তা মানুষ হলেই বা ক্ষতি কী? ছুটে ছুটে বেড়ায় যারা, সবাই কী সব পায়? আমিই কী কিছু পেলাম এতদিনে?

এখন মনে হচ্ছে কিছু একটা পেতে পারি। তাকে হেলায় হারাতে চাই না মিলি।’

 

মিলি জানে না আকিব আদৌ কথা রাখতে পারবে কিনা। কিংবা, আকিব কথা রাখলেও সেই গড়পড়তা মানুষটাকে মিলি মেনে নিতে পারবে কিনা। কিন্তু এই মুহূর্তে মনে হয়, সামনে যা দাঁড়িয়ে আছে সেটাই সত্যি। একটা উচ্ছ্বাস কাজ করে মনের মধ্যে। বনানী ব্রিজ থেকে দূরে তাকিয়ে দেখে সূর্যটা ডুবে যাওয়ার আগে লাল হয়ে উঠেছে। সেদিকে তাকিয়ে মিলি বুঝতে পারে তার করণীয়।

এদিকে গোধূলির মাঝেই শহরে স্ট্রিট লাইট জ্বলে ওঠে। সৌন্দর্য, লালিত্য না, শহর কেবল বাস্তব বোঝে। তার মধ্যেই মুহূর্তটা অলীক লাগে মিলির। যেন এমন গোধূলি আসেনি কখনো, আসবেও না। ওর খুব কান্না পায়। ফের গোধূলি দেখে।

আকিবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মিলি জিজ্ঞেস করে, ‘তাহলে? কি নাম দেবো ওর?’

মিলির দুই গালে হাত রেখে আকিব বলে, ‘তুমিই বলো…’

 

সম্পর্কিত লেখা