প্ল্যাটফর্মে
লেখক: মাহমুদ (Mahmud) · ২২ এপ্রিল, ২০২৬ · বিভাগ: গল্প
রাসেলের সঙ্গে ইমির দেখা হবে অনেকদিন পর। ইমি আসবে কমলাপুর স্টেশনে। দূর শহর থেকে। কতদিন পর রাসেলের সঙ্গে দেখা হবে তার! দেখা করে তারপর শহর ঘোরা। এই নিয়েই গল্প
পা মচকানোর আর সময় পেল না! ঠিক যখন তাড়াহুড়া করতে হবে, তখনই একটা না একটা সমস্যা হবে। রাসেলের এই সমস্যা অনেকদিনের। ছোটবেলায় একবার একশ মিটার স্প্রিন্ট দিয়েছিল। ১০ মিটার বাকি থাকতে জুতা ছিঁড়ে গিয়েছিল। অথচ সেই সময় জুতা ছেঁড়ার কোনো কারণ ছিল না।
আজকে অবশ্য কোনো রেসে হারবে না রাসেল। কিন্তু ইমি স্টেশনে নামার পর সে পৌঁছতে চায় না। তবে বাংলাদেশ রেলওয়ের ওপর এইটুকু ভরসা রাসেলের আছে—সময় মতো সে আসবে না।
দ্বিতীয়বার দেখা হচ্ছে তার ইমির সাথে। দুই মাস আগে একবার এসেছিল। সেদিন খুব সময় নিয়ে দেখাসাক্ষাৎ হয়নি তাদের। ইমির একটা পরীক্ষার তারিখ পড়েছিল। সেই সূত্রেই ইমির আসা, তাদের সাক্ষাৎ। তবে এবার ইমি আসছে কেবল রাসেলের সঙ্গে দেখা করার জন্যেই।
অন্য সময় হলে রাসের ডিও দিতো গায়ে। কিন্তু আজ ইচ্ছা করে না তার। মনে হয়, এমনই ঠিক আছে। কিন্তু ভোর পাঁচটায় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয় চুলগুলো ঠিক নেই। আর? আর? গোসল করা দরকার। কিন্তু এই সকালে গোসল করতেও ইচ্ছা করে না তার।
আলো তখনো ফোটেনি ঠিক মতো। রাসেল টের পায় ঢাকায় শীত পড়তে শুরু করেছে। সকালে এমনিতেই তাপমাত্রা থাকে কম। কিন্তু তার মধ্যেই বেশ ভালো বাতাস আছে। এর মধ্যে গোসল করতে বড় কষ্ট। তবু সে ঢুকে যায় বাথরুমে। চার থেকে ছয় মগ পানি ঢেলে বেরিয়ে আসে।
ঠকঠকানি কমাতে চা খেয়ে নিল এক কাপ। খুব বেশি সময় লাগেনি। ঘড়িতে এখন ৫টা ২০ বাজে। কমলাপুর স্টেশনে যেতে তার লাগবে ১৫ মিনিট। কিন্তু নামতে গিয়েই বিপত্তি। সিঁড়ির শেষ ধাপে পা রাখতে গিয়েই মচকে গেল। অবশ্য খুব বেশি না, একটু ব্যথা লাগছে। তবে রাসেল জানে, পরে বাড়বে একটু করে।
ঠিক ৫টা ৪৫ মিনিটেই স্টেশনে পৌঁছায় রাসেল। প্লাটফর্মে পৌঁছতে আরও পাঁচ মিনিট। ধূমকেতু তখনো এসে পৌঁছেনি। ইমি টেক্সট করে জানিয়েছে, কোনো কারণে তেজগাঁও স্টেশনে থেমে আছে। তাতে আপত্তি নেই রাসেলের। অনেকটা সময় আগেই পৌঁছতে পেরেছে।
ঢাকায় শীত পড়ে না খুব বেশি। হয়ত পৌষের শেষ আর মাঘের শুরু মিলিয়ে কিছুটা পড়ে। কিন্তু ইমি বলেছে রাজশাহীতে এর মধ্যেই বেশ শীত পড়েছে। এইতো, দুইদিন আগে সেও একটা কানটুপি পরে ছবি তুলেছিল। ছবিটা দেখে হেসেছিল রাসেল। ইমিকে খেপাচ্ছিল শীতকাতুরে বুড়ি বলে।
সকালের স্টেশন অন্য রকম। আর যদি হয় শীতের সকাল, তাহলে তো কথাই নেই। কিছু মানুষ অপেক্ষায় আছে। তারা বসে আছে ওয়েটিং জোনে। এখনো ভারি জ্যাকেট, কোট, সোয়েটার পরা শুরু করেনি লোকে। পাতলা কিছু জড়িয়েছে তারা গায়ে।
প্ল্যাটফর্মে কিছু মানুষ ঘুমায়। আগের থেকে তাদের সংখ্যা কমেছে, দেখতে পায় রাসেল। কিন্তু এখনো অনেক রকম মানুষ আছে। এইযে একজন ঘুমিয়ে আছে, মাথার নিচে একটা চটের ব্যাগ। এই ব্যাগ এখনো কেউ ব্যবহার করে, রাসেলের জানা ছিল না। কিন্তু একজনের মাথার নিচে আছে মানে এই একটা ব্যাগই তৈরি হয়নি। এমন আরো অনেক ব্যাগ তৈরি হয়েছে আর মানুষ তা ব্যবহারও করে।
বসার জায়গা থেকে উঠে হাঁটতে শুরু করে রাসেল। দুই পা হাঁটার মধ্যেই ওকে পাশ কাঁটিয়ে গেল একটা বাচ্চা ছেলে। গায়ে একটা লাল সোয়েটার। মাথায় হলুদ রঙয়ের টুপি। মনে পড়ে, অনেকদিন আগে রাসেল বাবার হাত ধরে এসেছিল স্টেশনে। সেটাও ছিল শীতকাল। তবে শীতের শুরু না, মধ্য শীত ছিল। কিংবা ও ছোট ছিল বলেই একটা মোটা সোয়েটারের ওপর কানটুপিও পরিয়ে দিয়েছিল মা। সেদিন প্ল্যাটফর্ম ধরে অনেকটা দৌড়ে গিয়েছিল—ঠিক এইমাত্র দেখা বাচ্চা ছেলেটার মতো।
ঢাকায় শীত পড়ে না খুব বেশি। হয়ত পৌষের শেষ আর মাঘের শুরু মিলিয়ে কিছুটা পড়ে। কিন্তু ইমি বলেছে রাজশাহীতে এর মধ্যেই বেশ শীত পড়েছে। এইতো, দুইদিন আগে সেও একটা কানটুপি পরে ছবি তুলেছিল। ছবিটা দেখে হেসেছিল রাসেল। ইমিকে খেপাচ্ছিল শীতকাতুরে বুড়ি বলে। ইমি অবশ্য নিজেকে বুড়িই বলে। কারণ সে এই সময়ের মেয়েদের মতো আধুনিক না। সাহসের তার অভাব নেই, কিন্তু ইমি মনে করে সাহস থাকলেও দুঃসাহসিক কিছু করে বসা উচিত না।
ইমির ভাবনায় এতোটা মশগুল হয়ে ছিল যে রাসেল খেয়াল করেনি, প্ল্যাটফর্মের শেষ মাথায় চলে এসেছে। উল্টো ঘুরে আবার হাঁটা শুরু করে। আশেপাশে তাকায়। শীত আসার শুরুর প্ল্যাটফর্মটা সে দেখার চেষ্টা করে।
অন্য প্রায় সব স্টেশনেই প্ল্যাটফর্মের ওপর দোকান আছে। ঢাকাতেই নেই শুধু। এখানে দোকান স্টেশনের সামনের অংশে। আসলে রাসেলের এক কাপ চায়ের তৃষ্ণা হয়েছে আবার। এর মধ্যেই ওর মনে পড়ে একবার ভোর চারটায় ঈশ্বরদী জংশনে থেমেছিল ট্রেন। মিনিট দশেক ছিল সেখানে। নামবে কি নামবে না, বুঝতে পারছিল না। শেষে নামল। প্ল্যাটফর্মের দোকানে এক কাপ দুধ চা নিয়েছিল। তৃতীয় চুমুকেই মনে হচ্ছিল চা গেছে ঠাণ্ডা হয়ে। কমলাপুরের প্ল্যাটফর্মে তা হওয়ার সুযোগ নেই।
মাঝামাঝি এসে আবার ফোন চেক করল। ইমির ট্রেন ছেড়েছে তবে চলছে আস্তে। রাসেল বসে পড়ল। তাকিয়ে দেখল সামনের দিকে। কেন যেন আজ কোনো প্ল্যাটফর্মেই ট্রেন থেমে নেই। সে তাকিয়ে দেখতে পারছে অনেকদূর। প্ল্যাটফর্ম পার করে খালি জমিতে গজিয়ে আছে ঘাস। আরো নানা রকম আগাছাও সেখানে কম নেই। এই জায়গাটায় ছোটবেলায় হেঁটেছিল সে একবার।
ইমির সঙ্গে কথা হচ্ছিল রাসেলের, তারা কোথাও ট্যুরে যাবে কিনা। কবে যাবে। ইমি বলেছিল, ‘ছয় মাসে রাজশাহী আসতে পারলা না একবার। ট্যুরে কীভাবে যাবা?’
ওইতো সামনে দিয়ে একজন চলে গেল, ওইখানেই গিয়েছিল হয়ত। একটা ফাঁকা ট্রেনের বগি পড়ে ছিল সেখানে। কোথা থেকে একটা লোক এসে ওকে বলেছিল, একা একা এখানে ঘোরাফেরা করা ঠিক না। কেন ঠিক না, সেটা রাসেল বুঝতে পারেনি। তবে আরো বড় হওয়ার পর বুঝেছিল ওইসব খালি বগিতে অস্থায়ী রূপোপজীবিনীদের পাওয়া যায়। খদ্দেররা আসাযাওয়া করে।
যে লোকটা এইমাত্র চলে গেল এদিক সেদিক দেখে, সেও হয়ত কোনো খদ্দের। অথবা হতে পারে এই রেলওয়েরই কোনো কর্মচারি।
রাসেলের ইচ্ছা হচ্ছিল স্টেশনের বাইরে গিয়ে পত্রিকা স্টলের সামনে দাঁড়ায়। সেখানে এখন হয়ত কিছু লোক দাঁড়িয়ে পত্রিকা পড়ছে, কিংবা পড়ছে না। তবে চায়ের দোকানে নিশ্চিত বিক্রি বেড়েছে। কেননা প্ল্যাটফর্মে আনাগোনা বেড়েছে যাত্রীদের। চিন্তা ছিন্ন হয়ে যায় রাসেলের।
চারজনের একটা পরিবার এগিয়ে আসছে। একজন পুরুষ আর তিনজন নারী। পুরুষটির বয়স চল্লিশের কোটায়। নারীদের একজন বোরখা পরা। একজন তরুনী। আরেকজন তার তরুণ বয়স পার করেছেন। ইমি পুরুষটির স্ত্রী, আর অন্য দুজন তার শাশুড়ি ও ননদ—রাসেল সিদ্ধান্ত নিল।
তবে এদের নিয়ে তার চিন্তা জমল না। একটু পরেই দেখা গেল ওর বয়সী একটা ছেলের হাত ধরে আসছে একটা মেয়ে। দুজনের পরনেই জিন্স আর শার্ট। সম্ভবত ট্যুরে যাচ্ছে। ইমির সঙ্গে কথা হচ্ছিল রাসেলের, তারা কোথাও ট্যুরে যাবে কিনা। কবে যাবে। ইমি বলেছিল, ‘ছয় মাসে রাজশাহী আসতে পারলা না একবার। ট্যুরে কীভাবে যাবা?’
রাসেলের মনে হয় সে কথা। অনেকবারই মনে করেছে যাবে কিন্তু হয়ে উঠল না। কেন হলো না, তার সাতকাহন মনে হতেই পিঠে গরম লাগতে শুরু করে। এসব বিষয় মনে করতে চায় না সে। ফোনের দিকে তাকায়। আর তখনই ট্রেন আসার শব্দ পায়। রাসেল উঠে দাঁড়ায়, পায়ে পায়ে গিয়ে যেতে থাকে ট্রেনের দিকে। সে খেয়াল করে, একটু একটু বুঝি রোদ উঠছে।
তবে সে রোদ শরীর পোড়ায় না। রিকশায় ইমির পাশে বসে রাসেলের মনে হয় কুসুমের উষ্ণতা অনুভব করছে সে। ইমির চুল বাতাসে উড়ে ওর মুখের আশেপাশে পড়লে খেয়াল হয় শীতের সকালের বাতাস এমন করে সে অনুভব করেনি অনেককাল। ‘এ হাওয়া’ শুনে তার সব সময়ই মনে হয়েছে তা সন্ধ্যা কিংবা গভীর রাতের কিন্তু আসন্ন শীতের এই সকালে ইমির পাশে বসে তার মনে হয় এমন সকালের হাওয়াও তাকে নিয়ে যেতে পারে অনেক দূর। যেতে ভয়ও নেই কারণ, চারপাশে একটা মিঠে আলো। ইমির হলুদ সালোয়ার কামিজের সাথে মিশে গেছে কিংবা তার গাল থেকে আভা এসে লাগছে চোখে।