অনিন্দ্য নীল
লেখক: মাহমুদ (Mahmud) · ১৭ এপ্রিল, ২০২৬ · বিভাগ: গল্প
রাত সাড়ে দশটায় দেখে লঞ্চের ডেক প্রায় অর্ধেক খালি। সুন্দর মতো একটা ভালো জায়গা দেখে কালো চাদরটা বিছিয়ে দিয়েছিল। এমনটা ফজলুলের সাত বছরের অভ্যাস। গত এক বছর সেটায় খানিক পরিবর্তন এসেছে।
বরিশালের লঞ্চের পুরনো জৌলুশ এখন আর নেই। অবকাঠামোগত জৌলুশ আছে কিন্তু রোয়াব নেই আগের মতো। থাকার কথাও না। এক পদ্মা সেতু সব হালচাল বদলে দিয়েছে। একটা সময় প্রতিদিন বড় বড় সাত আটটা লঞ্চও ছেড়ে গেছে। কিন্তু এখন সেখানে দুটো লঞ্চ। তাও ছাড়ে রাত দশটা, কখনো এগারোটায়। নয় ঘন্টার জানির্ করে এখন আর কেউ যেতে চায় না। কেননা চার পাঁচ ঘন্টায় সড়ক পথেই যাওয়া যায়। সবাই বাস ধরেই যায়।
কিন্তু পুরনো পথটা ছাড়তে চায় না ফজলুল। তার ভালো লাগে। কিংবা বহুদিনের অভ্যাস।
ফজলুল আহসান কাজ করে একটা কসমেটিকস কোম্পানিতে। সেলসের কাজ। সপ্তাহে ছয়দিন দশ-বারো ঘন্টার কাজ। তারপর ঘুম। দুই তিন মাস পর একদিনের ছুটি। ফজলুল লঞ্চের ডেকে উঠে ঘুম দেয়। দীর্ঘ ঘুমের পর জাগে। বাসে এমন ঘুম হয় না।
আজ আসতে দেরী হয়ে গেছে। তবু রাত সাড়ে দশটায় দেখে লঞ্চের ডেক প্রায় অর্ধেক খালি। সুন্দর মতো একটা ভালো জায়গা দেখে কালো চাদরটা বিছিয়ে দিয়েছিল। এমনটা ফজলুলের সাত বছরের অভ্যাস। গত এক বছর সেটায় খানিক পরিবর্তন এসেছে। এখন রাত বারোটার পর ওপর তলায় উঠে যায়। কেবিন বয়দের ম্যানেজ করে অল্প টাকায় একটা কেবিন নিয়ে নেয়। ঘুমটা ভালো হয়। নিরাপদে। নিশ্চিন্তে।
কিন্তু আজ ঘুম নেই ফজলুলের। চাকরির টালমাটাল অবস্থা। কেম্পানির অবস্থা খুব একটা খারাপ না কিন্তু তাদের সাবান আর শ্যাম্পুতে বিষাক্ত কেমিক্যালের উপস্থিতি পেয়েছে মোবাইল কোর্ট। এই নিয়ে পত্রিকা, টেলিভিশনে রিপোর্ট। খাঁড়ার ঘাঁ এসে পড়েছে ফজলুদের মতো কর্মীদের ওপর। রোষ সব তাদের ওপর ঝাড়ছে। যেন কেমিক্যাল ব্যবহার করতে উপদেশ দিয়েছিল তারা!
দুই মাস আগের ঘটনায় প্রথমে বেতন কেটেছিল। কোম্পানির আয় কম দেখিয়ে। দ্বিতীয় মাসে কাটা গেল কয়েকজন কর্মীর নাম। ফজলুলের কিছু টেকনিক আছে। সে মাল গছাতে যেমন জানে, তেমনি জানে কোম্পানির লোকের মন ভজাতে। তাই চাকরিটা টিকে আছে এখনো।
কিন্তু এর মধ্যে পরশু ডাক পড়েছিল হেড অফিসে। ফজলুলের এলাকার সেল কমে প্রায় অর্ধেক হয়েছে। এমন হওয়ার কারণ জানতে চাইল ম্যানেজার। ফজলু বলেই ফেলল, ‘কেমিক্যাল কেলেঙ্কারির পর লোকে আর কিনতে চায় না তাদের প্রডাক্ট। সেই কারণে দোকানদাররাও রাখতে চায় না।’
ফজলুল জানে, একথা না বলে কোনো একটা অযুহাত খাঁড়া করলে কেউ কিছু বলত না। কিন্তু ম্যানেজার ক্ষেপে গেল এই সত্যটা শুনে। আসলে কোনো প্রতিষ্ঠানই নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক কোনো কথা শুনতে চায় না। কোম্পানির খরচে খাওয়া দু টাকার কর্মী সে রকম সত্য উচ্চারণ করলে কর্তাদের আরো গায়ে লাগে।
কিন্তু দীর্ঘ দশ বছরের কর্মী বলেই হয়ৎ ফজলুলের চাকরিটা গেল না। বেতন কমানো হলো এক হাজার টাকা আর বলা হলো সেলস বাড়াতে হবে অন্তত ৭৫ শতাংশ। নাহলে চাকরি থাকবে না তার। ফজলুল জানে এটাও বেশিদিনের বিষয় না। তাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বোঝানো হচ্ছে মান সম্মান রেখে যত দ্রুত পারো চলে যাও। কিন্তু ফজলুলের এখন যাওয়ার কোনো উপায় নেই। বয়স তার কম হয়নি।
সুরভীর ডালটা খুব পছন্দ। এই লঞ্চে আসাদ জার্নি করছে প্রায় বারো বছর ধরে। প্রথম যাত্রা ছিল বিশেষ কারণে। ইউনিভার্সিটির দ্বিতীয় বছর প্রেমিকাকে নিয়ে উঠেছিল সে। হিমি তখন আসাদের সঙ্গে রমণের জন্য মুখিয়ে উঠেছিল। সেই সময়েই একদিন বিছানা ভাগ আর একটা ট্যুর করার ইচ্ছা থেকে হিমিকে নিয়ে উঠেছিল এই লঞ্চে। সারা রাত একটা বদ্ধ কেবিনে দুজন দেহসুধা পান করবে ভেবেছিল। কিন্তু তা হয়নি। দোষটা ছিল চাঁদের। পূর্ণিমার পরের দিন ছিল বোধ হয়। একটা মস্ত চাঁদ, আলোর বন্যায় ভাসিয়েছিল চারপাশ। নদী কতটা সুন্দর হতে পারে, আসাদ জেনেছিল সেদিন।
এর চার বছর পর আসাদ এঁকেছিল সে রাতের ছবি। একটা আকাশ, একটা নদী, একটা চাঁদ আর একটা নৌকা। তেলরঙ পছন্দ আসাদের। তখনো সবটা বাগে আনতে পারেনি কিন্তু এঁকেছিল। হাফিজ স্যার বলেছিলেন, ‘টেকনিকের চেয়ে আবেগটা বেশি হয়ে গেছে। তবে ওভারঅল কাজটা ভালো হয়েছে আসাদ।’
সেই একজিবিশনে প্রথম পুরস্কারটা পেয়েছিলেন হাফিজ স্যার, দ্বিতীয়টা আসাদ। কী ছিল সেই ছবিতে আসাদ নিজেও জানে না। কিন্তু নদীকে ভালোবেসেছিল। হিমি ছিল না জীবনে আর কিন্তু বারবার আসাদ লঞ্চে চড়ে বসত, সুযোগ গেলেই। এঁকে ফেলত এক একটা ছবি।
এর মধ্যেই উঠেছিল আরেক বাই। সুরভীর ক্যান্টিনের ডালের প্রতি তার জেগেছিল ভালোবাসা। তাই ডিনারের পর আরেক বাটি ডাল নিয়ে সে বসে বারান্দায়। প্রতি বারের মতো এবারও ব্যতিক্রম হয়নি।
বিষয়টা অবাক লাগে ফজলুলের। একটা লোক লঞ্চের বারান্দায় বসে বসে ডাল কেন খাবে? সে চা খেতে পারে। সিগারেট খেতে পারে। মদ খেলেও লঞ্চে কেউ কিছু বলতে আসবে না। কিন্তু এই লোক খায় ডাল। দেখতে ভদ্রলোকের মতোই তবে একটু পাগলা টাইপ। ফজলুল আগেও দেখেছে লোকটাকে। গতবার যাওয়ার সময়। রাত দুইটায় একবার বাথরুমে যেতে হয়েছিল। তখন দেখেছিল কেবিনের পর্দা সরানো। ভেতরে একটা মোম জ্বালিয়ে ক্যানভাসে ছবি আঁকছিল লোকটা।
’ভাই, ভালো আছেন?’ প্রশ্নটা করেই ফেলে ফজলুল আহসান।
ডাল খাওয়া শেষ হয়েছে আসাদের অনেকক্ষণ। সে একটা সিগারেট ধরাবে ঠিক দুই মিনিট পর। এমন সময় ফজলুল প্রশ্নটা করল। নিরপরাধ প্রশ্ন। আসাদ নিজে বহু লোকের সঙ্গে আড্ডা মেরেছে। সে জানে কিছু লোক কথা বলতে পছন্দ করে। লঞ্চে ট্রেনে তো আরো।
’ভালো আছি,’ মিষ্টি করেই বলল আসাদ। ফিরতি প্রশ্ন করল, ‘আপনি কেমন আছেন?’
’আমি ভাই ভালোই আছি,’ পণ্য বিক্রি করতে অভ্যস্ত ফজলুল খুব সুন্দর করে কথাটা বলে। আসাদ খেয়াল করে রগের কাছে চুলে পাক ধরা লোকটার বয়স হতে পারে চল্লিশ থেকে পঞ্চাশের যে কোনোটা। আসাদের বয়স মাত্র সাঁইত্রিশ। সামনের লোকটা তার তুলনায় বয়স্ক এতে সন্দেহ নেই।
প্রোফাইলটা এক নজরে স্টাডি করে ফেলে আসাদ। মনে হয় এই ব্র্যাকগ্রাউন্ডে একজন উদাস, পরাজিত লোকের ছবি খুব একটা মন্দ হবে না। কিন্তু আসাদের মনে হয়, পরাজিত শব্দটা কেন মাথায় এল তার? সামনের লোকটার নাম ধাম এতোক্ষণে জেনে নিয়েছে আসাদ। পেশাও। তাই হয়ত এমন মনে হয়।
ফজলুল কিন্তু আজ কোনোকিছু বেচার চিন্তা করে না। আসাদের মতো এক শিল্পীর কাছে সে অনেক কিছুই বেচতে পারে। ফজলু যে কেবল কসমেটিকস বিক্রি করে এমন তো না। সে পাশাপাশি নানা দালালিও করে। এখন অবধি মেয়ের দালালিটাই শুধু করেনি। এছাড়া জমি, ফ্ল্যাট, গাড়ি অনেককিছুরই দালালি করেছে। ঢাকা থেকে বরিশাল যেতে সে একবার একটা টয়োটা করোলা বিক্রি করেছিল। মোবাইল বিক্রি করেছে হরহামেশা।
আজ চাকরি যাবার মুখে কোনো কারণে ফজলুলের ইচ্ছা করে না কোনো বিক্রি বিষয়ক কথা বলতে। বরং সে অবাক মানে আসাদের গল্প শুনে। সেই প্রথম যখন আসাদ সুরভীতে উঠেছিল, সেদিনের কথা ফজলুকে বলেছে আসাদ।
‘তারপর থেকে আপনি ছবি আঁকতে লঞ্চে ওঠেন?’, অবাক হয়ে প্রশ্নটা করে ফজলুল।
আসাদ হাসে। প্যাকেট বের করে সিগারেট সাধে ফজলুলকে। ফজলুল সেটা নেয়। তারপর ধরিয়ে আগ্রহী মুখে তাকায় আসাদের দিকে। সব সময় ফজলুলই বক্তা হয়েছেন নানা সাক্ষাৎকারে। কারণ তাকে বলতে হতো পণ্যের গুণাগুণ। এই প্রথম সে শুনছে।
আসাদ বলল, ‘কখনো এমন হয়েছে আমি একদম ব্ল্যাংক হয়ে গেছি। তখন ছুটে যেতাম রাঙামাটি, বান্দরবার, কক্সবাজার। কিন্তু লাভ হতো না। পেতাম না কিছু। তারপর একদিন চড়ে বসি সুরভীতে। খুঁজে বের করি সেই কেবিনটা যেখানে আমি উঠেছিলাম হিমির সাথে। হ্যাঁ, পরদিন আঁকতে পেরেছিলাম একটা ছবি।’
’আপনি কি প্রেমিকারে মিস করেন? বা তারে মনে করেন অনুপ্রেরণা?’, টিভির সাংবাদিকের মতো প্রশ্নটা করে ফজলুল।
আসাদ এবার হেসে বলে, ‘না ভাই। প্রথমে তাই মনে করতাম। পরে দেখলাম, এমন কিছু না। এমনিই। বিয়ে করেছি পাঁচ বছর। সংসারেও আমি সুখি। তাহলে ফিরি কেন? আমার মনে হয় আমি নদীর কাছে আসি। নদীর কাছে ফিরি। লঞ্চটা হয়ত অনুষঙ্গ। কিংবা….’
থেমে যায় আসাদ। এর মধ্যে ক্যানভাস বের করে এনেছিল সে। ফজলু দেখতে চেয়েছে তার ছবি আঁকা। দুই চেয়ারের মধ্যে একটা ফোল্ডিং টেবিল খুলে তাতে প্যালেট রেখেছে আসাদ। চেষ্টা করছে কিছু একটা আঁকার। একটা রাজহংস, একটা সরোবর এমন কিছু। কিন্তু আকাশের রঙটা মেলাতে পারছে না।
ফজলুল একবার বাথরুমে যাওয়ার দরকার মনে করে। ঘুরে আসে। এসেই আসাদের পেছনে দাঁড়িয়ে ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকে কতক্ষণ। আসাদকে বলে, ‘আপনার ছবিটা উচ্ছ্বল কিন্তু নীল রঙটা মৃত্যুর মতো হইতেছে। আরেকটু হালকা করেন। দেখবেন ছবিটা খোলতাই হবে।’
একজন নেহাৎ ছাপোষা মানুষটির একথা শুনে আসাদ অবাক মানল। কিন্তু সত্যিই বদলে দিল রঙটা। প্রায় এক ঘন্টার চেষ্টায় রঙ বদলের পর আসাদ দেখল, সত্যিই। এমনই চেয়েছিল সে। এমনই সুন্দর। ফজলুকে ছবিটা দেখিয়ে আসাদ বলল, ‘আপনি… মানে, কেমন করে বুঝলেন?’
ফজলুল হাসলেন। হেসে বললেন, ‘ভাই, আমার মনে হয় আমরা বস্তুর কাছে ফিরি না। ঘটনা বা স্মৃতির কাছে ফিরি। আপনার ছবিটা আমাকে এক সকালের স্মৃতির কাছে নিয়ে গেল। আমার ছোট মেয়েটা বিকালে হাঁস তাড়াইয়া আনত পুস্কুনি থেকে। এক বিকালে আমিও গেছিলাম ওর সাথে। সেই বিকালটার আকাশ যে রঙ ধরছিল, রঙটা মনে পড়ল। সেই স্মৃতি দিলাম আপনার ছবিতে।’
আসাদ দেখল ফজলুলের মুখে সুখি মানুষের এক হাসি। আসাদের খুব ইচ্ছে করছিল সকালের নীল আকাশের পটে ফজলুলের একটা পোর্ট্রেট তৈরি করে। আসাদ এতোদিন মনে করত নীল কেবল বিষাদের রঙ। প্রথম তার মনে হলো সকালের এই নীল প্রশান্ত, পবিত্র। নীলের একটা নতুন শেড দিল তাকে ফজলুল। মনে মনে আসাদ তার নাম দিল অনিন্দ্য নীল।