সঞ্জয় গান্ধী, হাজি মাস্তান, মুম্বাই ও রুখসানা সুলতানা
লেখক: মাহমুদ (Mahmud) · ৫ এপ্রিল, ২০২৬ · বিভাগ: গসিপ
গাঙ্গুবাই কাথিয়াওয়ারি, স্বপ্না দিদি, হাসিনা পারকাররা তো বহুল আলোচিত। তাদের মতো ডাকসাইটের লেডি ডন না হলেও রুখসানা সুলতানার গল্পও দারুণ কৌতূহলোদ্দীপক। দিল্লির অভিজাত পার্টিগুলোতে উপস্থিত হতেন তিনি। নজর কাড়তেন সহজেই। নিখুঁত পোশাকে তার ছিল আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গি। ছিল ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ। একদিকে সঞ্জয় গান্ধী, অন্যদিকে হাজী মাস্তানের সঙ্গে তাকে জড়িয়ে মুম্বাইয়ে নানা গল্প চাউড় ছিল। আরো মজার ব্যপার—তিনি অমৃতা সিংয়ের মা। সাইফ আলী খানের শাশুড়ি।
গাঙ্গুবাই কাথিয়াওয়ারি, স্বপ্না দিদি, হাসিনা পারকাররা তো বহুল আলোচিত। তাদের মতো ডাকসাইটের লেডি ডন না হলেও রুখসানা সুলতানার গল্পও দারুণ কৌতূহলোদ্দীপক।
দিল্লির অভিজাত পার্টিগুলোতে উপস্থিত হতেন তিনি। নজর কাড়তেন সহজেই। নিখুঁত পোশাকে তার ছিল আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গি। ছিল ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ। একদিকে সঞ্জয় গান্ধী, অন্যদিকে হাজী মাস্তানের সঙ্গে তাকে জড়িয়ে মুম্বাইয়ে নানা গল্প চাউড় ছিল। আরো মজার ব্যপার—তিনি অমৃতা সিংয়ের মা। সাইফ আলী খানের শাশুড়ি।
রুখসানা সুলতানার জন্ম ১৯৩৪ সালে। তার মা জারিনা সুলতানা ও বাবা মোহন বিম্বেট। জারিনা ছিলেন নায়িকা বেগম পারার বোন। পঞ্চাশের দশকে রুখসানার বিয়ে হয় শিভিন্দর সিং ভির্কের সঙ্গে। ভির্ক ছিলেন ভারতী সেনাবাহিনীর অফিসার। তিনি বিখ্যাত সাংবাদিক খুশবন্ত সিংয়ের আত্মীয়। রুখসানা ও ভির্কের ঘরে ১৯৫৮ সালে জন্ম অমৃতার। পরবর্তীতে রুখসানার সঙ্গে ভির্কের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়।
রুখসানার সঙ্গে সঞ্জয় গান্ধীর সম্পর্ক বহুল চর্চিত। ১৯৭৫ সালে ভারতে জরুরি অবস্থা জারি করলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। নাগরিক অধিকার স্থগিত, সংবাদপত্রে সেন্সরশিপ, বিরোধীদের গ্রেপ্তার—দেশ যেন এক নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করল। এই সময়েই ক্ষমতার অন্দরমহলে দ্রুত উত্থান ঘটে ইন্দিরাপুত্র সঞ্জয়ের।

সঞ্জয় গান্ধীর ‘পাঁচ দফা কর্মসূচি’র অন্যতম লক্ষ্য ছিল জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাঠপর্যায়ের মুখ হয়ে ওঠেন রুখসানা সুলতানা। পুরনো দিল্লির মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে অভিযান তদারকির দায়িত্ব তার হাতে আসে। প্রশাসনিক ক্ষমতার জোরে দ্রুত লক্ষ্যপূরণ করাই ছিল উদ্দেশ্য।
জরুরি অবস্থার সেই সময়টায় দিল্লির ঘিঞ্জি বস্তি ও পুরনো শহরের অলিগলিতে ভয়ের আবহ তৈরি হয়েছিল। অভিযোগ ওঠে—অনেক ক্ষেত্রেই মানুষকে চাপ দিয়ে, কখনও হুমকি দেখিয়ে নির্বীজন করানো হয়। রুখসানা সুলতানার নাম বিশেষভাবে জড়িয়ে যায় এই অভিযানের সঙ্গে। সমর্থকরা বলেন, তিনি সরকারের নীতি বাস্তবায়নে দৃঢ় ও কার্যকর ছিলেন। সমালোচকদের মতে, তার ভূমিকা ছিল কঠোর এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের উদাহরণ।
এই দ্বৈত মূল্যায়নই তাকে একদিকে ক্ষমতাশালী প্রশাসনিক মুখ, অন্যদিকে বিতর্কিত রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত করে। কাছাকাছি সময়েই হাজি মাস্তানের সঙ্গে এক ‘সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক’ গড়ে ওঠে তার।
হাজি মাস্তান ১৯৬০–৭০ দশকে বন্দরভিত্তিক চোরাচালান ব্যবসার মাধ্যমে মুম্বাইয়ের অপরাধ জগতের এক কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন। যদিও মুম্বাইয়ের নিম্নবিত্ত মুসলিমদের কাছে তিনি একজন মসিহা। সেই সময়ের গসিপ ও সংবাদমাধ্যমে রুখসানা ও হাজি মাস্তানের সম্পর্ক নিয়ে নানা জল্পনা ছিল। যদিও এসব বিষয়ে নিশ্চিত ও প্রামাণ্য তথ্য সীমিত, তবু তাদের নাম একসঙ্গে উচ্চারিত হওয়ায় রুখসানার চারপাশে ‘গ্ল্যামার ও আন্ডারওয়ার্ল্ড’–এর এক মিশ্র ইমেজ তৈরি হয়।

মুম্বাইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ড তখন কেবল অপরাধজগত নয়, বলিউড ও রাজনীতির সঙ্গেও জটিল সম্পর্কে জড়িত ছিল। ফলে রুখসানার ব্যক্তিত্ব ঘিরে তৈরি হয় এক ধরনের আধা-রোমান্টিক, আধা-অস্বস্তিকর কিংবদন্তি।
তবে লেখিকা ও সম্পাদক শোভা দের স্মৃতিকথায় রুখসানাকে পাওয়া যায় আরও কৌতূহলোদ্দীপকভাবে। স্টারডাস্ট ছেড়ে তখন সোসাইটি সম্পাদনা করছেন শোভা। একটা স্টোরি করার সূত্রে রুখসানার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয় তার। রুখসানার বেডরুম অবধি গিয়েছিলেন তিনি। রুখসানা নিজেকে গয়নার নকশাকার দাবী করতেন। শোভাকে তিনি স্বর্ণ, মুক্তার গয়না উপহার দিতে চেয়েছিলেন। তবে সেসব গয়নার নকশা শোভার পছন্দ হয়নি। তাছাড়া তিনি ‘ঘুষ’ নিতেও চাননি।
দ্বিতীয়বার শোভার সঙ্গে রুখসানার দেখা হয় একটি পার্টিতে। হাজি মাস্তানের বাহুলগ্না ছিলেন রুখসানা। হাজির কাছে ফোন আসছিল একের পর এক। তিনি কখনো কড়া, কখনো কর্তৃত্বপূর্ণ স্বরে নানা নির্দেশ দিচ্ছিলেন। সেই সময় রুখসানা শোভাকে বলেছিলেন, ‘মুম্বাইয়ের ছোট বড় ব্যবসায়ী, পাতি নেতারা আমাকে খুব সম্মান করে। ওদের এলাকায় গেলে গলায় মালা দেয়।’

এইসব সম্পর্ক স্বাভাবিকভাবেই মুম্বাইয়ের উচুতলা থেকে নিচুতলা, ট্যাবলয়েড থেকে ম্যাগাজিনের চর্চার বিষয় ছিল। আর এর জের টানতে হয় রুখসানার কন্যা অমৃতা সিংকে। আশির দশকে আমৃতা সিং যখন বলিউডে আত্মপ্রকাশ করেন, তখন অনেকেই মায়ের রাজনৈতিক অতীতের প্রসঙ্গ টেনে আনতেন। তবে আমৃতা নিজের অভিনয় দক্ষতা ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে আলাদা অবস্থান তৈরি করেন। রুখসানাও পরবর্তী সময়ে অনেকটাই জনচক্ষুর আড়ালে চলে যান। যেন এক ঝড়ো অধ্যায়ের পর নীরবতা বেছে নেন।
রুখসানা সুলতানার সম্পর্কে পড়াশোনা করতে গিয়ে প্রশ্ন জাগে, তিনি কি ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছে পৌঁছে যাওয়া এক উচ্চাভিলাষী নারী, যিনি সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজের অবস্থান গড়ে নিয়েছিলেন? রুখসানার জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় ভারতের সত্তরের দশক ছিল ক্ষমতা, ভয়, গ্ল্যামার ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণের সময়। সেই সংমিশ্রণের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রুখসানা সুলতানা হয়ে উঠেছেন ইতিহাসের এক আলো-ছায়াময় চরিত্র—যাকে নিয়ে কৌতূহল, বিতর্ক ও কিংবদন্তি আজও থামেনি।