একা মোর গানের তরী...
লেখক: মাহমুদ (Mahmud) · ২০ জুলাই, ২০২৬ · বিভাগ: ঘোর
অনেক অনেক কাল আগের কথা। একটা গন্ধ উঠত তখন, বর্ষার সময়। মাটি থেকে। বৃষ্টিটা হলো কেবল শুরু, তার মিনিট পাঁচেক মতো থাকত। ওটাই সেই মাটির সোঁদা গন্ধ যা নিয়ে কত জনের কত কথা, কথা লেখা, কত চিন্তা।
ছাইরঙা মেঘগুলো ছুটে যাচ্ছে। টাইম ল্যাপ্সে ভিডিও করলে দেখা যাবে ওরা ছুটছিল বুলেটের গতিতে। আসলে তা না, মেঘ চলছিল শান্ত নদীর জলের মতো। কিংবা পুকুরের থির জলের বুকে ওঠা কাঁপনের মতো। আমার অবশ্য মনে হলো, ওরা ভেসে যাচ্ছে যেমন নদীর বুকে ভেসে যায় পালতোলা নৌকা। যায় না, আসলে যেতো। যেমন আমাদের অনেক কিছুই অতীত হয়ে গেছে। সুরের মতো, গানের মতো।
নূর জাহান তখন গাইছেন—আজ দেখা তুঝকো দের কে বাদ/ আজ কা দিন গুযার না যায়ে কাভি। অথচ দিনের পর দিন আমার এমন গেছে যে দিনটা পার হলেই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। সেইসব দিনও কোনো না কোনো গানের শরণ নিয়েছিলাম। গানের কথা দিয়েছিল সাহস। সুর দিয়েছিল শক্তি। এখনো গানের কথা শুনি, সুর বাজে কিন্তু ভেসে যায় না, ভাসিয়ে নেয় না।
অনেক অনেক কাল আগের কথা। একটা গন্ধ উঠত তখন, বর্ষার সময়। মাটি থেকে। বৃষ্টিটা হলো কেবল শুরু, তার মিনিট পাঁচেক মতো থাকত। ওটাই সেই মাটির সোঁদা গন্ধ যা নিয়ে কত জনের কত কথা, কথা লেখা, কত চিন্তা। বাস্তবে সেই সোঁদা মাটির গন্ধের অস্তিত্ব অনেক অল্প সময়ের। যেমন ক্ষণিক থাকে আমাদের সুখ। আমাদের স্বপ্ন। আমাদের কিংবা আমার।
শহুরে ব্যস্ততার জীবন। সেখানেও এমন দিন গেছে কিছু না করেই কাটিয়ে দিয়েছি অনেকটা সময়। স্রেফ পড়ে থেকে। তখন নিয়ম করে শুনতাম না তবে আমার চারপাশে কোনো না কোনোভাবে তো গীত হয়েছিল—কেটেছে একেলা, বিরহের বেলা/ আকাশ কুসুম চয়নে। অথবা কোনোদিন, যখন সবকিছুর বাইরে গিয়ে নিজেকে অন্য কোথাও টেনে ছুঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে হতো তখন তো ভেতরে কেউ বলেছে—ভেঙে মোর ঘরের চাবি, নিয়ে যাবি কে আমারে?
কেননা, ‘তুম সে মিল কার হামে রোনা থা...’ এখন বুকের মধ্যে বুড়বুড়ি কাটে না আর। জিভের আগায় গ্লুকোজ ছোঁয়ালে মুহূর্তের যে শিরশিরানি অনুভূতি, তেমনটা দিয়ে মিলিয়ে যায়।
কিছু মানুষ প্রচণ্ড অস্থির হয়। তাদের দেখলেই বোঝা যায়, এটা করছে সেটা করছে, বকছে, গড়ছে, ভাঙছে। কিন্তু আরেক ধরনের মানুষ আছে। এসব কিছুই করে না। পড়ে থাকে, বসে থাকে, ঝিমাতে থাকে। মনের মধ্যে একসঙ্গে চলে অনেকগুলো দুনিয়া। আমিও সেই রকম। মাথার ভেতর একসঙ্গে চলতে থাকে কুরুক্ষেত্র আর কারবালা। অথচ আমি নীরবে বসে থাকি। সয়ে থাকি। কবে এসব তৈরি হলো জানি না। হয়ত শান্ত কিন্তু গভীর এক পুকুরের পাড়ে কালচে পানির দিকে তাকিয়ে থাকা বিকেলে। কিংবা শরতের গভীর রাতে বিছানায় শুয়ে লঞ্চের ভোঁ শোনার মধ্যে। অথবা কাঁচা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ভাটফুল দেখে আর দ্রোণপুষ্পের মধু খেয়ে।
তারপর কত শত বছর পেরল। এখন খাদের কিনারে দাঁড়ালে.... শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা আর পড়া হয় না। ভুলে যেতে বসেছি আট বছর আগের এক দিন। চতুর প্রেমিক প্রবরের মতো কথায় কথায় আওড়াতে পারি না গালিব, মীর, গুলযারের শের। একটা সময় মনের মধ্যেই চলত মুশায়রা। এখন সেখানে নানা রকম বিন্যাস সমাবেশ, হিসাবের খাতা, ওষুধের নাম এসে বসেছে। তার মধ্যেই কোনো এক দিন পিয়া চক্রবর্তী গেয়ে উঠেছিলেন, তোমারো অসীমে। আমি ফের একদিন ফিরাক খুলে বসি। হঠাৎ পাওয়া অবসরের বিকালে মীরের সঙ্গে মিলিয়ে শুনতে চাই জর্জ বিশ্বাসের গলায় রবীন্দ্রনাথের গান। কিন্তু কেন যেন আর সিঙ্ক করে না।
বুড়ি চাঁদ বোনোজলে কখন ভেসে গেছে, আমার জানা হয় না। আমার জানলার ধারে উটের গ্রীবার মতো নিস্তব্ধতা ঠিকই জমে থাকে।
অলক কুমার সেন যখন সুদর্শন ফকিরের গীতি গেয়ে ওঠেন, আমার ঠোঁটের কোণায় হাসি ভর করে। তারপর আবার হারিয়ে যায়। কেননা, ‘তুম সে মিল কার হামে রোনা থা...’ এখন বুকের মধ্যে বুড়বুড়ি কাটে না আর। জিভের আগায় গ্লুকোজ ছোঁয়ালে মুহূর্তের যে শিরশিরানি অনুভূতি, তেমনটা দিয়ে মিলিয়ে যায়।
জীবনের পথ দুর্গম। তারচেয়েও বড় কথা, পথ চলতে হয় একা। আলো নিয়ে কেউ হয়ত আসে। কখনো আবার আলোই নিভে যায়। ফের থাকে অন্ধকার। থাকে হাজারটা বেদনা-মাখা মলিন কায়া। যতই বলি, যতই মনে হোক, ‘আমার মন মানে না’, ঝুলে থাকা বেদনা আর হেলে পড়া ঘাড়ে তখনো থাকে অনেক দায়িত্ব। তাই চাইলেও তরী ভাসিয়ে আনমনে বসে থাকা যায় না। বাইতে হয়। আমি বেয়ে যাই। কখনো হাল ছেড়ে দিই। গলুইয়ে বসে থাকি।
বুড়ি চাঁদ বোনোজলে কখন ভেসে গেছে, জানা হয় না। আমার জানলার ধারে উটের গ্রীবার মতো নিস্তব্ধতা ঠিকই জমে থাকে। ইঁদুরেরা ঘরময় কিচকিচ করে ঘুরে বেড়ায় রাতভর। আমি এই ঘোর যৌবনেও থুত্থুরে অন্ধ পেঁচার মতো কায়াহীন এক অশ্বত্থের ডালে চোখ ওল্টায়ে বসে থাকি। কেননা ওল্টানো চোখ থেকে জল ঝরবে না। ফুলে থাকা কর্ণিয়ায় জমে থাকবে জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার।
ট্যাগ: #সাহিত্য