মাহমুদের মহাফেজখানা (Mahmud Writes) · সকল লেখা · বই

বুকসম্যাক্সিং: বই পড়া যখন ‘সেক্সি’ হয়ে উঠল

লেখক: · ১৮ জুন, ২০২৬ · বিভাগ: পপ-কালচার

booksmaxxing-woman-reading-book

সোশ্যাল মিডিয়ায় একটু ভালো করে তাকালেই বই নিয়ে নানা কনটেন্ট চোখে পড়ে। আছে বই-ছবি, বুক টক, বুকস্টাগ্রাম, বুক কনন্টেন্ট। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে বই পড়া শুধু একটি শখ নয়, বরং ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিমত্তা এবং এমনকি শরীরী আকর্ষণীয়তা, রূপ প্রকাশেরও মাধ্যম হয়ে উঠছে। এই নতুন ট্রেন্ডের নাম ‘বুকসম্যাক্সিং’।

মানুষ বই কেন পড়ে? সহজেই উত্তর দেয়া যায়—জানার জন্য, জ্ঞান অর্জনের জন্য। অনেকে অবশ্য বিনোদনের জন্যও বই পড়ার কথা বলবেন। সত্যি বলতে, একসময় বই পড়াকে নিছক জ্ঞানচর্চা বা অবসর কাটানোর অভ্যাস হিসেবেই দেখা হতো। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে সেই চিত্র বদলে গেছে এবং প্রতিদিন নতুন কিছু আসছে সেখানে। এখন বই পড়া শুধু একটি শখ নয়, বরং ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিমত্তা এবং এমনকি শরীরী আবেদন, রূপ প্রকাশেরও মাধ্যম হয়ে উঠছে। এই নতুন ট্রেন্ডের নাম ‘বুকসম্যাক্সিং’।

‘ম্যাক্সিং’ শব্দটি অনলাইন সংস্কৃতি থেকে এসেছে। এর অর্থ নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট দিক থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নত বা আকর্ষণীয় করে তোলা। সেই ধারাবাহিকতায় ‘বুকসম্যাক্সিং’ বলতে বই পড়াকে নিজের ব্যক্তিত্বের অংশ হিসেবে তুলে ধরা বোঝানো হয়। এমনভাবে তা করা হয় যাতে তা সামাজিক মর্যাদা ও আকর্ষণের উৎস হয়ে ওঠে।

ডেটিং অ্যাপ টিন্ডার ব্যবহারকারীদের প্রোফাইলে বইয়ের উল্লেখ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। মোটের ওপর ২৯ শতাংশ বেড়েছে। করে নারীদের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা সহজে দৃশ্যমান (৪১ শতাংশ)।

বছর দুয়েক আগে সম্ভবত, ফেসবুকে কেউ একজন 'অ্যানা ফ্র্যাঙ্কের ডায়রী' হাতে নিয়ে ছবি তুলেছিলেন। ছবিতে তিনি হাসছিলেন। এ নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল। অ্যানা ফ্র্যাঙ্কের বইয়ে কোনো রোমান্টিক গল্প নেই। হলোকাস্টের সময়কার স্মৃতি নিয়ে লেখা বইটির সঙ্গে তিনি মোহনীয় ভঙ্গিতে ছবি তুলেছিলেন। বছরখানেক আগে বাংলা নাটকের দুই তরুণ অভিনেতা-অভিনেত্রী রোমান্টিক ছবি তুলেছিলেন ‘ফরটি রুলস অফ লাভ’ নিয়ে। তারা নামটি দেখেই সম্ভবত বইটিকে রোমান্টিক মনে করেছিলেন। এর বাইরেও সোশ্যাল মিডিয়ার বুকস্টাগ্রামার, বুক কনটেন্ট ক্রিয়েটর এমনকি লেখক-লেখিকারাও বইয়ের সঙ্গে নিজেদের উপস্থাপন করেন। এই প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় একটা সময় বই বা বই পড়ার বিষয়টি গৌন হয়ে যায়। মুখ্য হয়ে ওঠে ব্যক্তির নিজেকে উপস্থাপন।

বুকসম্যাক্সিং নিয়ে সম্প্রতি একটি ফিচার প্রকাশ করেছে গার্ডিয়ান। তারা জানাচ্ছে, ডেটিং অ্যাপ টিন্ডার ব্যবহারকারীদের প্রোফাইলে বইয়ের উল্লেখ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। মোটের ওপর ২৯ শতাংশ বেড়েছে। নারীদের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা সহজে দৃশ্যমান (৪১ শতাংশ)। সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে ‘বই পড়া’ যেন নতুন করে জনপ্রিয়তার কেন্দ্রে চলে এসেছে। বই পড়া হয়ে উঠেছে ‘সেক্সি’ (শব্দটি নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত না)।

এর পেছনে আছে একটি সামাজিক ধারণা। মনে করা হয়, যারা বই পড়ে, তারা সাধারণত চিন্তাশীল, বুদ্ধিমান এবং গভীর ব্যক্তিত্বের অধিকারী। বইয়ের সারাংশ নিয়ে কাজ করে হেডওয়ে (অ্যাপ)। তাদের একটি জরিপে দেখা গেছে, ৭৫ শতাংশ মানুষ পড়ুয়া বা বইয়ের সঙ্গে নিজেকে সংযুক্ত বলে প্রকাশ করেন, এমন ব্যক্তিদের পছন্দ করেন।

এমনিতে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটু ভালো করে তাকালেই বই নিয়ে নানা কনটেন্ট চোখে পড়ে। আছে বই-ছবি, বুক টক, বুকস্টাগ্রাম, বুক কনন্টেন্ট। ফেসবুকে বইয়ের আলাপ একটা সময় টেক্সটভিত্তিক ছিল। এরপর ছবি যুক্ত করতে দেখা যেত। ছবি, ভিডিও দেখার প্রবণতা বাড়ার সঙ্গে এসব প্রচারের প্রবণতাও বেড়েছে। ইস্টাগ্রামে শুরু হয় বুকস্টাগ্রাম। ছবিকে ‘অ্যাস্থেটিক’ করে তোলার চেষ্টা ছিল সবার মধ্যে। অনেক সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার নিজেদের শরীরী ব্যক্তিত্বকেও উপস্থাপন করেছেন বইয়ের পাশাপাশি। তাদের অনুসারীও কম নয় এবং বই ও পাঠকের অঙ্গনে তাদের প্রভাবও অনেক। বই নিয়ে বিস্তারে আলাপকারীদের চেয়ে ইনফ্লুয়েন্সারদের ‘সাজেশন’ই পছন্দ করছেন পাঠক।

এরপর আসে বুক-টক, বই নিয়ে আলাপ। টিকটকের ‘বুকটক’ কমিউনিটি এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। এখানে বইয়ের রিভিউ, আলোচনা, সাজেশন এবং পাঠ-অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন লাখ লাখ ব্যবহারকারী।

জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী দুয়া লিপারও রয়েছে নিজস্ব বুক ক্লাব। তার ব্যক্তিগত পাঠ-প্রচারণা তরুণদের মধ্যে বই নিয়ে আলোচনার নতুন আগ্রহ তৈরি করেছে। ফলে বই ক্লাব এখন কেবল সাহিত্যপ্রেমীদের মিলনস্থল নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক ট্রেন্ড।

এসব নিয়ে সমালোচনাও আছে। অনেকেই বলেন, বই নিয়ে ভিডিও দেখা আর বই পড়া এক বিষয় নয়। তবু বাস্তবতা হলো, বুকটক নতুন প্রজন্মকে বইয়ের জগতে আগ্রহী করে তুলছে। প্রকাশনা শিল্পেও এর প্রভাব স্পষ্ট। অনেক বই সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর বিক্রির শীর্ষে উঠে এসেছে। অনেকে পাঠচক্রের নতুন সংস্করণও মনে করছেন এই প্রবণতাকে।

একসময় বই ক্লাবকে অনেকেই কেবল ‘বইপোকাদের আড্ডা’ বলে মনে করতেন। কিন্তু এখন সেই ধারণাও বদলাচ্ছে। যুক্তরাজ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বই ক্লাবের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বইপোকা ছাড়াও অনেকে যুক্ত হচ্ছেন। ২০২২-২৩ সালের মধ্যে বুক ক্লাবের নিবন্ধন ৪১ শতাংশ বেড়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে এইসব ক্লাব আবার ব্যক্তিকেন্দ্রিক।

জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী দুয়া লিপারও রয়েছে নিজস্ব বুক ক্লাব। তার ব্যক্তিগত পাঠ-প্রচারণা তরুণদের মধ্যে বই নিয়ে আলোচনার নতুন আগ্রহ তৈরি করেছে। ফলে বুক ক্লাব এখন কেবল সাহিত্যপ্রেমীদের মিলনস্থল নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক ট্রেন্ড।

অনেকের মতে, বই পড়ার প্রতি প্রকৃত ভালোবাসার চেয়ে বই হাতে ছবি তোলা বা নিজেকে ‘বুদ্ধিজীবী’ হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতাই বেশি দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ, বই পড়া কখনো কখনো জ্ঞান অর্জনের চেয়ে সামাজিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠছে।

বুকসম্যাক্সিংয়ের প্রভাব শুধু পাঠের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এখন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ‘বুককেশন’ বা বইকেন্দ্রিক অবকাশযাপন। এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা প্রিয় উপন্যাসের প্রেক্ষাপট ঘুরে দেখতে বিদেশ ভ্রমণে যাচ্ছেন। কোথাও আয়োজন করা হচ্ছে সাহিত্য উৎসব, কোথাও আবার রিসোর্টভিত্তিক বই ক্লাব কিংবা বিশাল লাইব্রেরিসমৃদ্ধ হোটেল। বই পড়া আর ভ্রমণ—দুটি অভিজ্ঞতাকে একসঙ্গে মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন ধরনের জীবনধারা।

কিন্তু এইসব থেকে আরেকটি প্রশ্ন জাগে। এগুলো কি বইভিত্তিক ট্রেন্ড নাকি নিজেকে প্রদর্শন করা, নিজের প্রচার করা? বিশেষত বইয়ের থিম না বুঝে সেই বইয়ের উপস্থাপন, কোরামভিত্তিক বুক-টক; বিষয়, লেখক ও প্রকাশককে সীমাবদ্ধ করে ফেলার ঘটনাও অজানা নয়।

অনেকের মতে, বই পড়ার প্রতি প্রকৃত ভালোবাসার চেয়ে বই হাতে ছবি তোলা বা নিজেকে ‘বুদ্ধিজীবী’ হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতাই বেশি দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ, বই পড়া কখনো কখনো জ্ঞান অর্জনের চেয়ে সামাজিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠছে।

এই সমালোচনার পেছনে আরও একটি কারণ রয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, সামগ্রিকভাবে বই পড়ার হার অনেক দেশেই কমছে। ২০০৩ সালের তুলনায় যুক্তরাজ্যে পাঠক কমেছে ৪০ শতাংশ। বাংলাদেশে এমন কোনো জরিপ নেই, জরিপ করলে ‘পড়ুয়া’র সংখ্যা কম বলেই দেখা যাবে। হয়ত বই বিক্রি হচ্ছে কিন্তু বই পড়া হচ্ছে না। অনেকে বই কিনে কেবল ছবিই তুলছেন। বুক-টকে বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনার তুলনায় প্রচ্ছদ আর প্রডাকশনের আলাপই থাকছে কেবল। ফলে প্রশ্ন উঠছে, বুকসম্যাক্সিং কি সত্যিই পাঠাভ্যাসের পুনর্জাগরণ, নাকি সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের একটি আকর্ষণীয় সংস্করণ তুলে ধরার কৌশল?

বুকসম্যাক্সিংকে কেউ দেখছেন সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ হিসেবে, কেউ আবার এটিকে নিছক প্রদর্শনমূলক প্রবণতা বলে মনে করছেন। তবে একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই, বই আবার আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। কভিডের আগের তুলনায় কভিডের পরে ছাপা বই নিয়েও মানুষের আগ্রহ বেশি দেখা যাচ্ছে। তো এইসব আলোচনা ও অভ্যাসের সূত্র ধরে আরও বেশি মানুষ বইয়ের পাতায় ডুব দিলে এই ট্রেন্ডকে ইতিবাচকই বলা যাবে। কেননা, হয়তো কেউ বই পড়ছে জ্ঞান অর্জনের জন্য, কেউ ব্যক্তিত্ব গঠনের জন্য, আবার কেউ সামাজিক মর্যাদার জন্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বই যদি মানুষের হাতে ফিরে আসে, তাতে সাহিত্য, সংস্কৃতিরই লাভ।